Powered By Blogger

শনিবার, ১৭ মার্চ, ২০১২

কবিতার ফেরীওয়ালা হাসানআল আব্দুল্লাহ

অনুভূতির বাস্তবতাই হচ্ছে সাহিত্যের বাস্তবতা।যা অনুভব করা যায় সেটাই বাস্তবতা-----সাহিত্যের বাস্তবতা।সুন্দর সব সময়ের জন্যেই সুন্দর,আবার যা আনন্দদায়ক, তাই সুন্দর।সুন্দর তর্কের দ্বারা নয়,যুক্তি বা প্রমাণের দ্বারা নয়,উপলব্ধির বোধ দ্বারা,স্বতঃস্ফুর্তভাবে স্বীকার্য্য।প্রাত্যাহিক জীবনে আমরা জগৎ এবং প্রকৃতির মধ্য দিয়ে সুন্দরকে খুঁজবার এবং তাকে প্রতিষ্ঠিত করবার নিরন্তর সাধনায় লিপ্ত থাকি।সুন্দরকে পাওয়ার বা তাকে উপস্থাপন করার শুরু সেই গুহাবাসী আদিম সমাজ থেকে----শিল্পের মাধ্যমে।এই শিল্প কাব্য,নাটক,সঙ্গীত,চিত্রকলা,নৃত্যকলা সবকিছুকে ঘিরে আবর্তিত।আর শিল্পের সবথেকে শক্তিশালী শাখা হচ্ছে 'কবিতা';যা কবিতার ফেরীওয়ালা হাসানআল আব্দুল্লাহ তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'ক্যাফের কবিতা'য় সুন্দরের উপলব্ধিজাত অনুভূতিতে স্পষ্টভাবে উচ্চারন করেনঃ
...............................
................................
দ্রুপদের মেয়ে তিনি,জন্ম তার পাঞ্চাল নগরে
সুকৃশ উদর,নিতম্ব সুন্দর;সোনা ঝরে নাকের কন্দরে।
পৃথিবীর প্রথম সুন্দরী সেই দ্রৌপদী ষোড়ষী,
উন্মাদ পড়শী
তার রুপে
চুপে চুপে
কেউ কেউ একে এক নিতে চায় ঘরে;
(হিন্দু মিথ)

নিরন্তর প্রস্তুতিই '৯০ দশকের অন্যতম শক্তিমান কবি হাসানআল আব্দুল্লাহ'র কবিসত্ত্বার অবচেতনের অলিন্দে সমকালের সঙ্গে মহাকাল,উত্তরাধুনিক বর্তমান সময়কে বাস্তবতার নিরিখে প্রখরভাবে আশ্র্য় করেছেন।জীবনানন্দ দাশ বোঝাতে চেয়েছিলেন,''শুধু বুদ্ধি কিংবা শুধু ভাবপ্রতিভাতেই সিদ্ধি নয় বরঞ্চ এই দুইয়েরই সমন্বয়ই মহৎ কবিতা জন্ম নেয়।'' সময়ের প্রতিফলন কবিতায় না থাকলে তা হয়ে যায় ভাষাহীন।এই বোধ থেকেই হাসানআল আব্দুল্লাহ'র কবিতা অন্ধকার থেকে আলো জ্বেলে প্রকৃত সত্য বের করে আনেন কবিতায়ঃ

বামচোখে ব্লাইন্ড স্পটের গাড়ি
দেখে মোড় ঘুরে প্রশস্ত পাহাড়ী
পথে অ্যাকসেলেটর চাপি---বাড়িমুখী
গাড়িগুলো পিঁপড়ের সারির মতন সুখী;
হাইবীমে আলোকিত সামনের রাস্তা---
কেউ কেউ যদিও কিছুটা আস্থা-
হীনতায় ভোগে;
কাউকে আবার পায় সেলফোন রোগে
কিম্বা নিয়ন্ত্রণহীন সঙ্গীতের ঘোর
লেগে কেউ কেউ মোড়
ঘুরে খাদে পড়ে যায়;
যান্ত্রিকতার এমন ভ্রুভঙ্গ খেলায়
কেউ কেউ মার্বেলের মতো
রাস্তায় ছড়িয়ে দেয় জীবনের স্বাদ ইতস্তুত

তারপর ফরেষ্ট পার্কের
অন্ধকারে ফের
দেখা হয় রুপসী রাতের সাথে;
গাড়ি থেকে নেমে তার হাতে
হাত শেকে
ভালো করে তাকে আরেকটু দেখে
ষ্টিয়ারিং হুইলে আবার
রাখি হাত;বার বার
মনে পড়ে পিছে ফেলে আসা সময়ের মুখ;
চলাই প্রধান---জানি-- আমাদের প্রকৃত অসুখ
(মুসলিম মিথ)

কবি হাসানআল আব্দুল্লাহ অতীত ঐতিহ্য 'মহাকাব্যিক মিথ' ব্যাখ্যা করেছেন বর্তমান সময়ের ওপর দাঁড়িয়ে।ইতিহাস চেতন ও দেশজ প্রেমের কারণে মিথগুলোকে প্রয়োগ করেছেন বাস্তব ও কল্পনার মিশ্রণে গভীর এক দায়িত্ববোধ থেকে;নিজের পারিপার্শ্বিক সময়,মহাকাব্যিক জ্ঞান ও সমকালীন অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে সমকালের বাটখারায়  মহাকালকে মাপবার।ফলতঃ তাঁর কবিতায় এক স্বতন্ত্র সুর বেঁজে ওঠে,যখন তিনি বলেন :

অলিম্পাস থেকে আফ্রোদিতির গলার হার পরে
হিরা আইডা পর্বতে এসে জিয়ুসের সাথে,মেঘের চাদরে
বিপুল সঙ্গমে যখন সমান্তরাল
হেকটরের দল রেখে ট্রয়ের সকাল
আস্তে আস্তে পিছু হটে,যদিও অ্যাপোলো
নেমে এসে ষোলো
আনা শক্তি ঢেলে দেন তার গায়ে
(গ্রীক মিথ)

হাসানআল আব্দুল্লাহ'র কবিতায় অস্থিরতা,হতাশা,ক্লান্তি,অনিঃশেষ নিঃসঙ্গতা যুগ মানসের যন্ত্রণার অভিঘাত সামগ্রিক উপলব্ধির চিত্র প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে।মানব জীবনের অপ্রাপ্তি ও অসম্পূর্নতা চিত্তকে বিলোড়িত করে।ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষায় মানুষের হৃদয় থেকে অপসৃত সহমর্মীতার বীজ এবং স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধছে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস।হাসানআল আব্দুল্লাহ দুঃখ করে বলেনঃ

পাবার কথা ছিলো শিল্প মর্যাদা
রাতের বিছানাতে তবু যে বাধ-সাধা
উলটে পড়ে থাকে আমার কবিতারা।
পাবার কথা ছিলো স্রোতের শিরদাঁড়া,
উজানে হেঁটে গিয়ে বৃষ্টি অকাতরে;
পাবার কথা ছিলো স্মৃতির কলস্বরে
সুষম বিন্যাস আশা ও হতাশার।
অথচ আজ দেখি একটি পাখি তার
নিজের ঠোঁট দিয়ে পালক ছিঁড়ছেন।
বাহঅনে চেপে যারা বাসায় ফিরছেন
মাছির মতো,এই করণ সন্ধ্যায়,
এবং ব্যাথা নিয়ে হিসেবী দুই পায়
চাকেও ভিড়ছেন যতোটা সম্ভব
তারাতো পান নাই সেসব গৌরব
যা দিয়ে যায় চেনা কাঁটা ও কাঁটাতার।
পাবার কথা ছিলো গভীরে নামবার
অনেক শক্তি ও সরল সঞ্চয়;
কিছুই পাই নাই,তাই তো ভয় হয়
পাবার কথা শুধু কথার জালটায়
আটকে অযথাই খোলস পালটায়
(খ্রীষ্টান মিথ)

কবিতা শুধুমাত্র Statement বা বিবৃতি নয়।কবিতার ভেতর দিয়ে কবি পথ করে নেন কাল,মহাকাল ও অনন্তলোকের।কবিতার বক্তব্য ও উপস্থাপনের কারণে এটা বিমূর্ত রুপ হয়ে ওঠে।কবিতা তখন আর কবিতা থাকে না,হয়ে ওঠে জীবঞ্চরিত দর্শনঃ

বুঝতে থাকে না বাকী
রাতারাতি বেড়ে ওঠা প্রলোভনের সবই ফাঁকি
লালসালু দায়ী যথারীতি---
ভুলে ভরা বিষাক্ত অধ্যায়---

যারা চায় আমরা সতত থাকি তাদের পায়ের নিচে
সেইসব মহগাপুরুষের পিছে
আহাজারি----অতঃপর
দায়ী ---জানি নিজহাতে
গড়ে তোলা তাদের ঈশ্বর
(ইহুদি মিথ)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন