শনিবার, ১৪ জুন, ২০১৪
ধূপের মতোন উড়ে গেছে প্রতিশ্রুত প্রেম-৪
৩১.
মায়ান বা তক্ষশিলা কিংবা যে কোনো পূরাণো সভ্যতার মতো সমস্ত ধ্বংসের শেষে কবরখানার মাটি ফুঁড়ে আরেক সভ্যতা এসে গেলে আমরা বলেছিলাম পূণর্জাগরন।অবিকৃত আগামীর গর্ভে কিছু বিস্ফোরণ...রঙের ঝলক।এইভাবে,এইভাবেই নূতন সভ্যতার শুরু অথচ সে জ্বলনের অরোরা আভায় শরীরের জল হয়ে ওঠে অগ্নিলাভা,গলন্ত ধাতু ও মাটির ভেতরে পচে যাওয়া হাড়ের স্তুপে বোনা বীজে হৃৎপিন্ডের রক্ত ঢেলেছি দু'বেলা যদি আশরীর ধ্বংস নিয়েও মেরুদন্ডের হাড় সীজা হয়ে দাঁড়ায়।মরণাহত জিজীবিষা,---প্রেম জেগে উঠেছিল ক্ষমার ভাষায়?সভ্যতার ইতিহাসে আবহমান বিচ্ছেদ।মানুষের ঘাতকজন্মে পাপযোগাদিদোষ।কালরাত্রিদোষে অন্ধ দুই চোখে স্থিরতা।আদিমতার নগ্ন প্রতিমানে গোপনে যে দুঃসাহসে ভর করে আগুন নেভাতে গিয়েছিলে---সেই আগুনে জ্বলছ্ব ঘর,সাজানো সংসার।বৃষ্টিভেজা রথের মেলায় যাই নি।পথশ্রমের গ্রামান্তরে উত্তর দক্ষিণ পূর্ব ও পশ্চিমে পায়ে পায়ে মুক্তি,মুক্তির শৃঙ্খল।
সহজাত মুক্তি এমন সহজলভ্য।
৩২.
শরীরের শেষতম হাড়ে কিছু পরিমাণ ত্বক লেগে আছে।মাটির আড়ালে মাটি চাপা দিয়ে ঘাসের বীজ ও জল (হৃৎপিন্ডের সব রক্ত জমে গেছে) ঢেলে মুছে দাও স্মৃতির সমস্ত চিহ্ন।গূঢ় লৌকিকতার পরাবাস্তব টানে এর চেয়ে বেশী খুঁজেছিলে অপার সম্ভাবনার স্তর?জায়মান শ্রেয়বোধে শিল্পের অন্বয়ে এবং প্রতিফলনের মতো বেঁচে থাকার অপর আয়নায় দেখি পূবের সমুদ্রস্রোতে আধপোড়া পুরুষ ভাসছে,---মরে গেছে বোধহয়।জলস্রোতে কার মুখ দেখেছিলে?রাত্রিময় অমাবস্যা থেকে উঠে আসে শবের মিছিল।চোখে তাদের জ্বলন্ত মৃত্যুচিহ্ন।বুকের আরেকদিকে বিমূঢ়তা?এতো বিমূঢ়তা ভালো লাগে?ভালো লাগে এইসব অলস ভাসানে ভেসে চলা ঘূর্ণিটান রাত্রি?অশরীরী অন্ধকারে তোমার করতলের স্পর্শে বাঁচতে চেয়েছিলাম।চেয়েছিলাম।নীরব পলের পাশাপাশি মাথার সমান্তরালে অতীতের স্থিরচিত্র।উপ্যাখ্যানের চরিত্র প্রেম দাবী করেছিল?তাদের স্মরণে দুঃখপথ-একে একে ম্লান খসে পড়ে উল্কা পতনের মতো।আমার ঘরের জানালাবিহীন অন্ধকারে বিচিত্র বর্ণের আলোকের ছটা ফেলেছিলে?জলের রেখার দীর্ঘ পরিসরে ধূয়ে নিয়েছিলে বিশীর্ণ হাহাকারের দুঃস্বপ্নের রাত।সেই তুমি কেন যে বালিকার স্পষ্টতায় ফুলে ওঠো?চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে অবিনাশ।কেউ জানে,কেউ জানে না।আমরা তার ক্ষীণ প্রান্ত ছুঁয়ে মুখোমুখি মুখোশের হাসি দেখেছিলাম।তোমার শরীরের নগ্নতা হাতের মুঠো ভরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম কচি শালপাতায় মুড়ে।আজ সেই পাপে অহর্নিশ ধ্বংসাবশেষের শ্বাস শুনি আর ঠোঁটের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে তেতো কষ।বাঘনখ আলিঙ্গনের ভেতর লাভা শরীর জড়িয়ে নিতে নিতে গোপন সংকেতে মনে পড়ে আমরা কীভাবে সমুদ্রের উষ্ণতায় উঠ গিয়েছিলাম।ভূ-মধ্যসাগরের স্রোত হঠাৎ সৈকতে এসে রুদ্ধ হল।তবু আমার স্বপ্নেরা দুপুরের,উবর্শী রাতের,সকালের শিশিরের জলে ধরে রাখে নীল যবনিকা।এর চেয়ে দীর্ঘ যবনিকা পৃথিবীতে আছে?ক্ষুধা ও নিবৃত্তিগানে মানুষ নিজেকে দ্বি-খন্ডিত,ত্রি-খন্ডিত কিংবা চতুর্খন্ড করে ফেলছে অথচ প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে দেখেছঃপৃথিবীর প্রতিচ্ছায়া কেমন শূন্যতা মেখে আছে?শূন্যতার ভেতর এতো ঢেউ কে রেখেছে?যথেষ্ট বর্ণনা ছিল না।বৃষ্টির পথ ভেঙে আষাঢ়ের কিছু অংশ ভেঙে ফেলেছিলাম।অন্যান্য বহু পুরুষের মতো আমি চেয়েছিলাম আমার নিজস্ব উঠোনে প্রতিশ্রুতিশীল নক্ষত্রের উত্থান ও দূর সমুদ্রের জাহাজের পাটাতনে শুয়ে নীল ঝর্ণাধারার জ্যোৎস্নায় অবারিত সৌন্দর্য্যে ছুটির অবকাশ।সকলেই চেয়েছিল সহজ আশ্রয় এবং ত্রাণ।এভাবেই বেঁচে উঠি ভাঙনের সীমানা,জলের অভাবে প্রাকৃতিক কূটিল লিখনে বৈপরীত্যে জোয়ার টানের মুখে।
৩৩.
দ্রুত ছিঁড়ে ফেলা রক্তমুখ ভরে ফেনা,আকাঙ্খিত অপরাধে গভীর অসুখ,---আমার মানবজন্ম সারাদিন দলাদলা জল কাটে,কী কঠিন সব জল?বৈঠার শাব্দিক অর্থে পাল্টে যায় নদীর দু’তীর,বালিচর,কাশের জঙ্গল।দাঁড়ের বিরহী টানে যে মুহূর্তে একা হয়ে যাই কাকের দুপুর,ফাঁকা জলপথে দেখা হয়ে যায় দু’য়েকটা সভ্যতার যদিও কখনও তাদের নাম জিজ্ঞেস করি নি কিন্তু সেই গুহাচিত্রের আদলে দীর্ঘ সে অতীতকালে সুগত চোখের জল মিশে গেছে নদী ও সমুদ্রে।আঁচলে সংসার ঢেকে ডুবে গেলে ঘনমুখে।জাগরনের ঐ পারে থেকে গেল আধখানা শাড়ীর আঁচল।জীবনের রেখাগুলো অনন্ত প্রবাহে কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে?তোমার দুই হাতের মুঠোতে আষাঢ়ের জলধারা।দেখো,ভেসে গেছে কত উন্মাদ যুবকদেহ।অতর্কিতে নদী পার হয়ে যাও।থেমে যায় জলযান,যাবতীয় স্রোত শুধু নদীর পূরাণে ভেসে থাকছে তোমার নাম।
৩৪.
ব্রাক্ষ্মমুহূর্তের প্রার্থনা শোন নি।প্রেত-নিঃশ্বাসে সময় জেগে উঠছে যন্ত্রণা এবং বিচ্ছেদের পূর্ববর্তী বাঁকে আর করপুট ভরে উঠে আসে মিথ্যে মানবজন্মের গান।তারপর ক্রমশঃ সংক্রান্তি,নৈবেদ্য,পূজোর মন্ত্র.....।সময় কী নৌকা?অনায়াস ভেসে যাবে সহজ জলের স্রোতে?তীরে বিচিত্র ও বিবিধ পুরুষ সমস্বরে ডাকছে।অবৈধ সম্পর্কের শেষে এতো অভিলাষ লুকিয়ে রয়েছে?দীর্ঘচুল,ইচ্ছাময় চোখে নানাবিধ আলো-অন্ধকার।ফেলে আসা ভাঙা মুখ ঝরে গেছে?অধোঃমুখে মনে পড়ে অতীতের প্রিয় মুখ?আদিম জলের মধ্যে অনেক কালের দুঃখ,কতো সমর্পণ,---জল কী হিসেব রাখে?দু’একটি নিরিবিলি দুপুর---মধ্যকপালে সূর্য আঁকা;ছায়া নেই,মেঘ নেই;আমাকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলে?ভেবে রেখেছিলে দুর্বিনীত ভাগ্যরেখায় পালটে দেবে সূর্য্যনাম?স্পর্শতিলে ধরে রেখেছো যে সীমারেখা,ঈষৎ গভীর---শরীর কাঁপিয়ে ঝড় আসে,ঠোঁটের ঈষাঙ্কোণে কালো মেঘ।শেষ আদরের পর পরিশ্রান্ত আঙুলে জড়িয়ে চেয়েছিলে নিভৃত সন্তান?কতটুকু জীবন লুকানো ছিল নগ্নবুকে?ওপরে আকাশ,দূরে কৌতুহলী নদীতে জন্মজন্মের আয়ুষ্কাল।আয়ুষ্মতী হও,নারী। আয়ুষ্কাল।আয়ুষ্মতী হও।যাকে ইচ্ছে পথ থেকে তুলে নাও।ডেকে যাও,প্রিয় কিংবা ডাকনামে আর একাকী নিষিক্ত ভ্রূণ খসে পড়ুক তোমার কালো গর্ভাধার থেকে।
৩৫.
সাপ,আপেল ও নারী,---সমস্ত ধর্মগ্রন্থের পাপ মেখে বসে আছো দুই হাতে।শুনে গেছো সারাদিন অতৃপ্ত প্রেমিক পুরুষের অনন্ত পতন।বেদনার প্রাণদাহী মৃত্যুর ফুলের মধ্যে জর্জরিত যে জীবন---শুষ্ক,পতিত ও অনুর্বর;তোমার অস্বচ্ছ হাতে হাত রাখলেই টের পাইঃবজ্রকলঙ্কিত,উলঙ্গের মুখোমুখি আরেক বিবস্ত্রা নারী দেহতাপের আধিক্যে গতরাতে যা বলেছো এই ঘাসের জঙ্গল,ফুলবন,---লিখে রেখেছি কীটদংশিত ঠোঁট,বুকের নখরাঘাত।সেতুহীন নদীতে পারাপারের মাঝি রাত্রির জীবন ভরে রাখে তার দ্বি-প্রহর মুখে।রাতের ললিতমাখা দেহ প্রিয় নিঃসীমতা ভুলে ভরে দিয়েছিলে---এমন সমর্পণের চাঁদ দেখিনি কখনও।আঙুলে,নখের কোণে অনুরাগ।মেহেদীর দাগ মুছে নিয়েছিল ঢেউয়ের উচ্ছ্বাসে?জল কেটে,নৌ-যাত্রায় পশ্চিমের দিকে এগিয়ে চলেছো?তীরে অন্ধত্ব ও অপেক্ষার গান গেয়ে যাচ্ছি আমি এক বধির যুবক।দীর্ঘ ও লম্বিত ফুঁ-য়ে ফেরাতে পারবো মৃত প্রেম? যা হারিয়ে গেছে-বিশ্বাস,পারস্পরিক সমঝোতা?আলোছায়াময় রাত্রি আর ময়ূরপালক দিন?তুমি মানবী ছিলে না।নারী হিসেবে তোমার কিছু শাপ থেকে গেল।মানুষ হিসেবে কিছু অনুচ্চারিত শব্দের প্রশ্নে অমীমাংসা থেকে গেল।নেশাতুর অপব্য জীবন ততটা স্বচ্ছ হল না-যতটা হলে বেঁচে থাকার আহ্লাদ জাগে।বিরুদ্ধগামী সময় এবং কালে ফুল-ফোটানোর সময় হয়েছে।কেই-বা হিসেব রাখে?
৩৬.
রাতের উপান্তে অন্ধকার নামছে।আমার পাঠ শেষ।দেখিঃআকাশের মুখে প্রলয়ের প্রতিবিম্ব।ধ্বংসঅভ্যাসে পুতুল গড়েছিলে;সেই কাদা,সেই মাটি,সেই পোড়ামুখে ধর্ম শুঁকছে পুরোহিতের দল।তোমার দু'চোখে প্রিয় পাপ,স্মৃতিকোষে অবাধ যৌনাচারের গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল।প্রত্যেক নিঃশেষ থেকে উঠে আসে ডুবোজাহাজের স্মৃতি।তাহলে কি পরিত্যক্ত বাতিঘর-ই তোমার শেষ পরিণতি? পাপের স্খালনে খুলে যায় মুঠো-আমার হাতের মধ্য থেকে খসে গেছে আট বছর আগের হাত;আঙুলের স্পর্শে গলে যেত শরীরের জ্বর,মাথার অসুখ।পিঠে,তোমার লুকোনো ডানা ছিল?গভীর বিপথে উড়ে গেলে জ্বলন্ত রাতপোষাকে।আদিগন্ত ঘর, উচ্ছনে সংসার,---নদী রঙের শাড়ীতে প্রাচীন মেঘের ধ্বংসস্তুপ।সহজ জলের স্তর খুঁজে পেয়েছো? নদীতে ঢেউ।নদীও ভুলে গিয়েছিল কোন পথে,কবে,সে এসেছে?ধূলো ও জীবাণু নিয়ে ফসলের গন্ধমাখা আলপথে সন্তর্পণে পার হয়ে গেছো কবে-টের পাই নি।একান্ত জলবায়ুগত দিন ও রাতের বিভাজন ভুলে পরকীয়া নিমন্ত্রণের অঢেল আয়োজনে।সিঁড়িতে রোদের দাগ এখনও রয়েছে।তোমার শরীরে রোদ বসেছিল।তাকিয়ে দেখেছিলামঃআশরীর উপোষী চকোর আধখানা চাঁদমুখ খুবলে খেয়েছে।বুকে-পিঠে কোমল রক্তের স্বেদবিন্দু।অসুখের সঙ্গে নিরালা এ-মাঠে চিরন্তন নখ-দাঁত শানিয়ে রেখেছো?তোমার দু’চোখে কৃষ্ণপক্ষ নাচে। কাঁপছে ডান পাশের ভ্রূ।এটা কোন ঋতু?চোখের পাতায় মধুকূপী ফুল।প্রবল ইচ্ছায় খুলে ফেলি অতৃপ্ত আঙুল।এই ঘর,এই ঘাসের বিছানা---একসঙ্গে পথে নেমেছিলাম।ঝোড়ো শ্বাস,সিঁড়ির আড়ালে রক্তমুখী ক্ষত।মাথার ওপরে ডাকিনী মেঘের দল নেচে যাচ্ছে।
অন্ধকার আমাকে বলেছেঃঅই মেয়েটিরও নাম অন্ধকার।
৩৭.
যা হবার কথা ছিল না অথচ প্রাগৈতিহাসিক দুঃখ ঢুকে পড়ছে পাঁজর ফুঁড়ে এবং আমরা জেনেছি আশরীর সমুদ্র মন্থনে ইতস্তত দুঃখ,কিছু দুঃখ প্রাচীন মাছের পাখনার নীচে শ্যাওলার মতো জমে আছে আমার মোহের এ-শরীরে বিষণ্ন ডানার এ্যালবাট্রস যখন শেষবার চেষ্টা করছিল লবণের ঢিবি,নারিকেল বাগানের সারি পার হয়ে যেতে-গতানুগতিক দায়বদ্ধতায় চির-পরিচিত পৃথিবী তখনও নিজের অক্ষের ভরে ঘুরছিল।হতাশাজনক শীতার্ত প্রহরে ভারি কুয়াশার আস্তর নিঃশব্দে নেমে আসছে চরাচরের ব্যপ্তি পার হয়ে আর অকপট নিসর্গপ্রতিভা প্রতিদিন জন্ম দিতে থাকে আত্মরক্তপাত,মৃতঘুঙুরের শব্দ।নিজের বাঁকানো মেরুদন্ডে অসতর্ক পদক্ষেপে একসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছিল অতীত,বর্তমান।ভবিষ্যতের গুহায় নিরপেক্ষ স্তব্ধতা ও কোলাহলে অগণ্য শব্দের বাঙ্ময় ও অবিকল্প শূন্যমেঘে সেইসব আদি অশ্রুগুলো এখনও শোভন।দৃশ্যপট ভরে আসে চৈত্র থেকে বৈশাখের স্বপ্নগুলোর বিপূল স্রোতধারা,চারপাশের গোধূলি বেলার আলোর মধ্যে জানাশোনা মানুষেরা কেমন স্তিমিত হয়ে যায়।তাদের আত্তপ্ত বাক্যগুলো হিম হয়ে যায়।সমস্ত চিন্তা ও চেতনার ভেতর পরাবাস্তববাদী ছায়া।শীতার্ত দিনের স্পর্শ ফেলে সকলেই খুঁজছে নিভৃত আকাশের উষ্ণতা।হৃদয় জ্বেলে দুই হাতে ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে মৃত্যু ও জীবন।
আমাদের দেখা হল অধিকন্তু বালির মন্দিরে কিন্তু কেউ-ই কারো মুখ দেখি নি।নিশ্চয়তার ভেজা মাঠে অপেক্ষার কালে আমরা পাথর হয়েছিলাম।পাশের মাঠে থকথক করছিল পয়ার,ছদ্মপূরাণ।
আমাদের কোনো কান্না যথাযথ নয়।নিম্নগতির সুষুম্না,আধা ধর্ম পথপাশে পড়ে আছে।সূর্যোকরোজ্জ্বল দুই হাত শূন্যে তুলে ডেকে গেছি।ছড়ানো পাখির ডানা-শোন নি সে ডাক।বোধিসত্ত্বে কার প্রাণ কামনা করেছো?অপরিমিত অন্ধকারের মধ্যে এতো সাজ?সূর্যোদয় থেকে সায়াহ্ন অবধি কঠিন শপথ,---সুগত ঐ চোখে কেনো এতো ভাঙা টুকরো,রাতের?করাল কালের কুম্ভীপাকে নিজের ধ্বংসের দিকে আমি কতোদিন শূন্যতার মধ্যে ভেসে আছি আশা ও নিরাশাহীম দোলাচলে,ঘেরাটোপের ভেতর।শূন্যতার ভেতর ঢেউ কিন্তু সৃষ্টি,সম্ভাবনা কিংবা প্রস্তাবনা নেই।তিরতিরে ঈথারের নীচে ঝর্ণা,নদী ও সমুদ্র।রুদ্রাক্ষের মালা ছড়িয়ে পড়ছে পথ ও পাহাড়ে।
আমি অপেক্ষা করছিঃতুমি নৈসর্গের নিস্তব্ধতা মেখে বসে আছো?
৩৮.
নিজের আদ্যন্ত আয়ু জ্বালিয়ে দু’হাতে কবর খুঁড়েছিলাম-তাই মুখ থুবড়ে ধূলোর নীচে পড়ে আছি।শ্মশানকালীর বিষ ও ভস্মের কণা এতো নিবিড় টানছে---ছারখার হয়ে যায় সমস্ত সাহস।বিবর্তনের বিকাশ,কুঁড়ি মেলা পদ্ম,---খরতোয়া নদীতে অনাব্য ঢেউ।রোমাঞ্চের কুহকিনী ডাক ফেরাতে পারো নি?সূর্যশিখর আবির্ভাবের স্বপ্নে ‘সুরঞ্জনা’হয়েছিলে?প্রচল ভাঙার সহজাত প্রবণতায় জ্যোৎস্নার এলোচুলে দুই চোখে হলুদ পাখির ডানা;বসন্তের বিশুদ্ধ নিয়ম অস্বীকারে পরিত্যক্ত ঘরে ফিরে যাবে?ঘরের ভেতর আলো ছিল---বিনত শুভ্রতা?ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছো?স্রোতের অনুগামীর মতো আমি প্রস্তুত।দেখবো, মালতীলতার অনায়াস দোল।
৩৯.
মাত্রাবৃত্ত জীবন চেয়েছিলাম-বন্যা-ই আমা্র নিয়তিতে বাঁধা। তুমি ও তোমার বহমান উদ্বাস্তু জীবন বেঁধে নিয়েছো নৌকার বে-আব্রু মাস্তুলে।শিরায় ফেনিয়ে ওঠে কালবিষ,অফলা বিদ্যুৎ আছে কিন্তু দাহ নেই।শোধ করেছো জন্মান্তরের প্রথম শস্যের গন্ধ?
যেভাবে দেখেছিলাম দগ্ধ দু'কোটরে সিঁদুরে গোধূলি নয়,---অন্ধকার মেঘ।অই মেঘে বৃষ্টি ঝরবে?দু'কূল ভেসে যাবে?সাথে অসম্পূর্ণ ঘর,কবিতার নীল খাতা?তোমার নিঃশ্বাসে কৃষ্ণচূড়ার সজীব বীজ ছিল---কোথায় হারিয়ে গেল সেইসব মোহময়ী দিন ও রাতের শ্রান্তিভার?শূন্য থেকে শূন্যে ভাসে কত অপমান তবু পানপাতার ঐ মুখে কেবলই জেগে উঠেছিল সবুজের রক্ত।সবটুকু শুষে খাবে?রেখার সারল্য,স্থানবিন্দু থেকে কালবিন্দুটুকু?এমন কী অতীতের কাতরতা?
বজ্রাহত বাড়ীর সমস্ত ঘর পুড়ে গেছে অথচ অটুট সমুদ্র বালিয়াড়িতে গড়া বাড়ী।জোয়ারও পিছিয়ে গেছে অনন্ত ভাঁটায় ডুবে আছে বেলাঞ্চল।কাঁটাঝোপ,লোনাবালি,---চক্রবাল ছিঁড়ে যেতে চেয়েছিলে?ঠিক কতটুকু উষ্ণতা চেয়েছো এক জীবনে?তবে কি হৃদয় জুড়াতে ঘাট থেকে ঘাটে,পাহাড়,সমুদ্র থেকে সমতলে নুড়ি কুড়াতে কুড়াতে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ,শিলচর থেকে সুরাট,কাশ্মীর থেকে কন্যা কুমারিকা---তমার দু'পায়ে যাত্রাক্ষত।রক্তে সিঁদুর গলবে?আচম্বিত জলস্রোতে আমাদের যৌথ দিনগুলো নদীপথ থেকে মোহনা,মোহনা থেকে সমুদ্র,সমুদ্র থেকে অতঃপর বাষ্পীভূত ঘনমেঘে শুধু লবণগুলো সমুদ্র তার বুকে জমিয়ে রেখেছে।এপিটাফ মুছে অবিশ্রাম ঝরে পড়ছে পূর্বাষাঢ়ানক্ষত্র,সন্ধ্যা এবং রাত।আবলুশ কাঠের কফিন নিয়ে ভেসে আসে স্বপ্নোত্থিত নৌকা---গলুইয়ে বসে বেহালার ছড় টানছে জন্মান্ধ গায়কের দল-তাদের সুরের মূর্ছনায় পূণর্গঠিত পাঠল;যারা কবিতাবিরোধী,--- প্রথম দশক ছুঁয়ে অনুভূতির প্রদেশে ক্রমাগত প্রশ্নচিহ্ন,টেরোড্যাকটিলের আঘাতে স্বপ্নভঙ্গ- এখানে সবাই এক বিরহের কালে।আমার নিস্পৃহ চোখ ডুবে যায় নিমগ্ন,গভীর ঘুমে।ঘুমের ভেতর সেই মানবজন্মের গান, অশ্রপতনের অপেক্ষা,---আবার উঠে দাঁড়াব?দূরের পূষ্যা নক্ষত্রের থেকে বিবিধ রঙের বায়ূস্তর ভেদ করে কেউ কি আসবে শরীরে জড়িয়ে ইমনকল্যাণ?আশরীর প্রথম বৃষ্টির জলে ভেজা রাগিণীরেখার মতো?হাতে ধরে ঘুরিয়ে আনবে অন্তহীন ভবিষ্যৎ?
খসে পড়া চিরায়ত ফলে ভরে আছে সমস্ত ফলবাগান,বীজ বোনা শেষ।এই গাছগুলোর ছায়ায় একদিন ছায়া নেবো।বুকের ভেতর এতো পরাভব।গ্রহণের সূর্যে তাকিয়ে দেখেছিলামঃআবহমানতার অঢেল ঢেউ ভুলে ছুটে যাচ্ছ ভাটির প্রবল টানে।
জল, তোমাকে ছোঁয় নি।
৪০.
তল,বিন্দু ও রেখার প্রকৃতিতে পরিধির পাশে অভিনয়-মাখা তোমার মুখের একপাশে আলো আর এক পাশে বর্তুলাকার গহ্বর।সুতৃপ্তির লজ্জা মুছে অন্ধকারে ভেসে ওঠে মধ্যরাতের নোঙরের স্মৃতি।দ্বাদশীর বুক ভাঙা যমজ মিথ্যের মধ্যে প্রবাহতরল মুখ আরও কালো হতে থাকে।এই যে নীলাভ অন্ধকার মেঘ,বৃষ্টি,সৌরধূলো,---তোমার স্বরতাড়িত দুই চোখে লালসার মল্ল-আষাঢ়ের ঢল।জলের ভেতরে মুক্তিপথ আছে?সূর্যের কৌণিক রেখা ঘিরে যৌবনের উন্মাদনা,দৃঢ় রুদ্ররেখায় ব্যসনা এবং বিলাসের ছড় টানিয়ে রেখেছো?উদাসিনী ছিলে না কখনও---তোমার বুকের মধ্যে অদৃশ্য নাচের টান।জনহীন নৈশ রাজপথে নিজস্ব গরিমাভাষা নেই তাই প্রতিপলে নিজের বিরুদ্দধে এতো জেদ,এতো বিরোধীতা তবু লাঞ্জনায় ছিন্নভিন্ন বুকের উত্তাপে ফুটে ওঠে সূর্যমুখী ফুল।সহজিয়া ভাষার প্রাকৃতবোধে শেষ কবে স্বপ্ন দেখেছো?ধ্বংসাভ্যাসের শ্বাস ও প্রশ্বাসে অবিরাম হেঁটে চলা সংকেতের সর্বনাশের সীমায় তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেছিঃশেষের তর্পণ,শরীরের বাঁকা খন্ডগুলো প্রেতিনীর হাঁ-করা মুখের দিকে ছুঁড়ে বলো,'নে,খা' অথচ শনাক্তযোগ্য নয় এমন অভিশাপের মধ্যে ঘন,সন্নিবেশিত লতাবীজ জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে রয়েছে।আমি জীবনের কথা বলতে চেয়েছিলামঃবর্ষা-আশ্রিত সঙ্গীত,বসন্ত ও শীতে সুরের বিস্তার ছিল।প্রেম-আরোপিত পথ ও প্রান্তরে অসুখের সঙ্গীত গেয়েছিলাম কথ্য ও চলিত ভাষা ও গভীর বেদনায়,---আজ সেই সমস্ত সঙ্গীত ঢেকে আছে মেঘের চাদরে।ঢেকে থাকল প্রেমের ইতিহাস;যেভাবে কুয়াশা ঢেকে দেয় নদী ও সমুদ্র,স্থিরতর ঝর্ণাজল ও সৈকতভূমি।বালুকণা উড়িয়ে দিক-নির্দেশ পেয়েছো?নাব্য পথের সন্ধানে খুঁজে দেখেছো জলফলক?সেতুহীন নদীর দু'পাশে মহিষের সারি চরছে;বিস্তৃত ছায়া পারাপারে।নদী পার হয়ে চলে যাবে আর বালুচরে মিশে যাক সুদূর বর্ষাসঙ্গীত এবং প্রতি-রক্তকণা থেকে ঝরে পড়ুক কবিতা।
+
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন