Powered By Blogger

বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন, ২০১৪

ধূপের মতোন উড়ে গেছে প্রতিশ্রুত প্রেম-৫

৪১. চারিদিকে শুধু বিপরীত জল।এমন প্রপাত-ঝরে পড়ে রুপালী আকাশ।ভেঙে দিয়ে সাজানো জীবন চিবুকে পাষাণ জেগে ওঠে,---রাতের রাক্ষুসী অন্ধকারে একে একে খুলে যায় গ্রহ-নক্ষত্রের গিঁট,ভেসে আসে মাতালের অট্টহাসি।ভেবেছিলাম কবেই মুছে গেছে সব। অর্থহীনতার ভেতর চৈতন্য,নেশা,কস্তুরী,অকাল বৈধব্যের শ্বেত পাখি অনুসন্ধিৎসায় মেলে ধরে তার দূরহ শিল্পকর্মের ডানা।জলের সীমান্ত ঘেঁষে চলা সারিবদ্ধ নৌকাগুলো একে একে থেমে যায় তোমার সংকেতময় চোখে।তোমার রক্তিম নখে খেলা করে ট্রাফিকের লাল, হলুদ,সবুজ আলো।বাস্তবতাবর্জিত চরিত্রহীন মুখজুড়ে আতসবাজির স্ফুলিঙ্গে বিনষ্ট বসন্তের স্তব্ধ ছায়া।নিমগ্ন প্রেম,বিরহের রক্তক্ষরণের পাশাপাশি বহু অবিশ্বাসে শরীরের ভেতর যে গান বেজে ওঠে,অপ্রস্তুত স্মৃতি,---গীতপঞ্চাশিকার এ-রাতে সমস্ত ব্যর্থতা ধূয়ে নেবে আদ্যাপান্ত।স্তুপের সমস্ত দিন ফেলে নামগানে ভেসে চলেছি।কে কাকে গীতময় সৃষ্ট জগতে আঁকড়ে ধরে এক বিদায় বেলার থেকে আর এক বিদায়ের মাঝখানে সরলরৈখিক পথ---সত্য ও মিথ্যার যমজজন্মের পূর্বাপর গানে ঐ পথের শেষে বুড়ো বটগাছ অনেক দেখেছেঃস্বতঃস্ফুর্ত ও দ্বিধাজড়িত পায়ে ঘর জ্বালিয়ে যাওয়া নারী,ব্যর্থ প্রণয়ের ইতিহাস, বিচ্ছেদ,মিলন এবং সন্তত জীবন। আমরা এইভাবেই প্রতিদিন বাঁচি এবং মরে যাই।নীরবতার চৈত্য ও দেহাতীত কূটভাবনার প্রাকার সন্ধ্যায় নিঃঝুম নির্বাসনের নগ্নতায় তোমার শরীরে বিবিধ বিম্ব-প্রতিবিম্বের উন্মাদনা,ভৌগলিক রেখা ঘিরে আদিম উল্লাস।দিগন্তের এইসব দখলদারির মাংস খুবলে নেয়া কাক ও শকুন---ডালিম গাছের ডালে ডানা ছড়িয়ে বসে আছে,নীচে জলকাদার ওপর লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। ৪২. তোমার অস্তিত্ব ঢেকে আছে অনাশ্রয় আর অবক্ষয়ে,---ফিরে আসবে?শেষরাতের সান্দ্র প্রহরে যে ঘর ফেলে এসেছো-সে ঘর চিরতরে পরিলুপ্ত।অবধারিতের এমন সময়ে পরিপ্রশ্ন ওঠে?প্রশ্নবানে জর্জরিত করে দেখো নিজেকে-সৈকতে তার ইতিবৃত্ত লেখাআছে।তোমাকে যে নামে ডেকেছিলাম-সে নামও বর্ণরীতি,ধ্বনিজ আবেশে পালটে গেছে কতো অবিশ্বাস্য যন্ত্রণায়।বিচ্ছেদের প্রান্ত থেকে ভয়াবহ সুষুপ্তির মাঝামাঝি সরলরেখার পথে ভাঙা রাতপাখা হাতে সময় পারাপারের যাত্রী---মোষ ও শুকরবাহী;সুখের ভেতরে সিঁড়ি আছে আরও ঊর্ধ্বে উঠে যাবার?রাস্তার বাতিগুলো তেমনি জ্বলছে।সেবারই প্রথম এ-পথে এসেছিলাম।নিখোঁজ যাত্রীদের তালিকার গন্ধ শুঁকে শুঁকে,পদচিহ্নে নাক গুঁজে অভিবাসী অসুরেরাখুঁজছে আমার নাম।আমি-তো নিখোঁজ নই,স্বেচ্ছা-নির্বাসিত কবিতার কাছাকাছি সরলতা খুঁটে নিই।তুমি তার কিছু ভাঙতে চেয়েছিলে?অকূল জোনাকীময় এই রাতে অন্য গ্রামের ডাকাত একাকার করে দেয় সমস্ত দিন ও রাত।তাদের পায়ের চাপে কেঁপে ওঠে জনপদ,পাথুরে নদী ও আমার নিয়তি।কোনো দুঃখ নেই, ভার জমে আছে শুধু।প্রতিবিম্ব নিয়ে যতদূর গিয়েছি-সুন্দর এসে মিশে থেকেছে প্রতিভাকণা এবং জীবিকার সীমান্ত প্রদেশে।শরীরের শিরা-উপশিরা ছিঁড়ে যখনই হাতে তুলে নিয়েছি হৃৎপিন্ড,---উদবৃত্ত কিছু নেই,পথের বিলাসে শূন্য-বাজনা বাজে না।প্রণতি ও উত্থানের মাঝামাঝি অদৃশ্য সুতোর জাল।অমন প্রাকৃত জালে আটকে রয়েছে অতীতকালের প্রেম,বেদনা ও অবসাদ। মুছে যাবার সাহস নেই-ফিরে পেতে দাঁড়িয়ে রয়েছি এই বাঁকানো সাপের পথে।জলকষ্টে ব্রতধারণের কথা ভুলে গেছি,ভুলে গেছি আমার সমস্ত দিন,রাত এবং সজীব আক্রোশভরা তন্বী শরীর।মুখর ভাঁজে একদিন আমাদেরও রাত্রির ভেতরে রাত্রি এসে মিশে যেত আর অন্ধকারের ভেতর থেকে গাঢ় অন্ধকার এসে ঢেকে দিত শিৎকার ও ললাটের তিলক,বিমূর্ত অভিমান।মাধবী লতার স্রোতে সেইসব আজ ভাসমান গল্প যেমন মৃত্যুর পর মৃত্যুভয় শুয়ে থাকে সমস্ত উঠোন,ঘরে।তোমার দু’চোখ ভরে যায় কালোপাখির ছায়ায়। ছন্দের ভেতরে,পঙতির ভেতরে তুমি বারবার নেমে আসো,আমাদের এতো দ্বিধা কেনো? ৪৩. সন্দেহমুখীন দুপুরের পথ এসে আমাদের সম্পন্ন উঠোনে মিশে গেছে আর আমাদের স্বপ্নেরা নিমগ্ন বালুকা বেলার।সংবাহন সূর্য নির্বিকার উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে।আজকের গল্পের শুরুটা এভাবেই ক্রমশঃ উচ্চতা এবং শিখর ছাড়িয়ে আরও দূরে পর্বতের মালভূমি কিংবা পাহাড়ের সানুদেশে ইত;স্তত রডোডেনড্রন গুচ্ছে,গর্ভবতী পাথুরে শিকড়ে,বাঁশ ও চন্দনপাতা-ম্লান করতলের ভেতর প্রত্যকের অচেনা শরীর অন্য শত শরীরে মিশেছে।চিরকাল তোমার বাহুর অভিলাষী-বুক জুড়ে শস্যহীন ঘূর্ণিপাত, পাঁজরের স্ফুলিঙ্গে ঝরছে মটরদানার মতো আগুনের দাগ।শ্মশানের হিরণ্ময় চিতা কতক্ষণ জ্বলে?আধ প্রহর?শাশ্বত আগুনের উপাসনামন্ত্র,বেদবেদাঙ্গবিৎ সত্যের ধর্মে অভিশাপ জেগে ওঠে। অরাজকতা ও ন্যায়পরায়ণতার ভেতর তোমার অনাদর হয়েছিল?অদ্ভূত রঙিন দিনগুলো কত চিহ্ন ধরে রেখেছে?বুঝি নি ধর্ম।সমূহ ক্ষতির পূর্বাপর মুহূর্তে আনুপাতিক ছায়া.....অতঃপর অপদেবতার ঘোড়ার খুরের শব্দে হাসতে হাসতে বলেছিলেঃ’এ-এমন কিছু নয়।‘প্রতিশ্রুতিশীল যে নক্ষত্র প্রতিদিন মাথার ওপর আলো দেয় –সেই জ্বালিয়ে দিয়েছে মাথা,বুক নাভী আর,আর অজস্র ইস্পাতি গুঁড়া ঢেকে ফেলছে চরাঞ্চলের যত বালি। ৪৪. সম্পন্ন শব্দের অন্তরালে দীর্ঘশ্বাস-অপরিণত শীতের পাখিগুলো উড়ে আসে আর স্বপ্নের ভেতর দেবদারু গাছ থেকে খসে পড়ে অজস্র হলুদ পাতা।আমি ঐ হলুদ পাতা ছুঁয়ে দেখেছি তোমার পরিণতির শূণ্যতা-বৃত্তময় চাঁদমারি গর্ভগর্ত।অন্য ধর্ম,বস্তুত তোমার চোখে জন্মান্তরের প্রস্তুতি।জন্ম ও মৃত্যুর সম্ভাবনাময় দূয়ার ও সহমরণের চিতা থেকে সরাসরি আমাদের সাংসারিক উঠোনে উড়ে আসে বাঁশপাতা।পরান্নলোভী সূর্য,কালো নক্ষত্র ও বালুকণা রোগজীবাণুর মতো শরীরে জড়িয়ে মুড়ে নাও মৃত শিশু। শ্মশানতলীর আঘাটায় সরাসরি ঢেউ এসে কেঁপে ওঠে আগুনের সর্বস্বতা। তুমি কোন সর্বনাশা খেলায় মেতেছো? নৈশকালীন আগুন জানে এবারের শীতের তীব্রতা।অনপনেয় হেমন্তে আমিও বুঝে নিয়েছি অশ্রুর নীল নিঃসঙ্গতা ও একাকীত্বের মহাবিষুবীয় রেখা আমার চিবুক ছুঁয়ে গেছে।পায়ের তলায় লুন্ঠিত,কাশ্মিরী শাল-তার ছেঁড়া,ম্লান সুতো শরীরে জড়িয়ে আছে পাকে পাকে এবং অতিরিক্ত মুনাফায় নেশাতুর চোখ মেলে দেখে নেই তোমার উলঙ্গ দেহে আগুন,উল্কির ছাপে আমার আত্মার চেয়ে মহার্ঘ্য রেশম এবং প্রত্যাখ্যানের চাতুর্যময় ভঙ্গি বলে দেয় কূয়াশার ঐ পারে সূর্যাস্ত অতঃপর বিদায়ের ঘন্টাধ্বনি.....। আধোলিন প্রতিটি বসন্তে আমাদের নাম লেখা ছিল।নিভৃত বাতাসে সেইসব সুন্দর দিনগুলোর স্বচ্ছ জল অন্তিম গোধূলি নিয়ে বুকের ভেতর আলো জ্বালে।জোনাকী পোকার হাজার ডানার শব্দে সেইসব আজ চাপা পড়ে আছে। তুমি কোন দুঃখে ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছ? ঘরপোড়া রমণী,নিষ্পাপ মৃতদেহে দীর্ঘ কালিগোলা ছাপ,অকাম কামনা,---এক একদিন এই ঘুমন্ত শরীর অনুপম মেঘের মতোন উড়ে যায়;যারা ফিরে আসতে চেয়েছে-বছরের ক্লান্ত শেষদিকে অগণ্য পালক পড়েছিল-হলুদ পাতার মতো এতো শীর্ণ পথ পার হয়ে কেউ-ই আসে নি।অদৃশ্য বিদ্যুতে পুড়ে গিয়েছিল যে ডানা-সৌন্দর্য্য অবলুপ্ত সমস্ত ভুলতে হাতে তুলে নিই মেঠোফল।সুন্দর নিয়তিগুলো জ্বলে একা একা বজ্রাহত,দীর্ঘ ঝড়জলে। ধাতুর গলানো চাঁদ থেকে তরল ফোটায় শালবনে ঝরে পড়ে অপর্যাপ্ত টানে লেখা 'সতর্কলিখন।' ৪৫. পশুচলাচলের সুড়ঙ্গ পথে বিষাক্ত আত্মার অশালীন বীজানুবিস্তার,ঘূর্ণায়িত দুই চোখে জীবনের অর্থহীনতা ও অনিষিক্ত ভ্রূণে শকুনের ডানা-মুখে খর মরভূমি নিয়ে চিরায়ত সকালের প্রতি পলে বিষাদ;চেতনাহীন শূন্যের ভেতর লোকায়ত অমর্ত্য ফুলের ঘ্রাণ মুছে বিপরীত প্রতিদ্বন্দ্বী বোধে কপালের একপাশ থেকে আর এক পাশে উড়ে যায় সারাৎসার বিচ্ছেদের নীল।নির্নিমেষ করুণ অঙ্গারে বুক,নাভী,ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হতে হতে সমস্ত শরীর মর্ম ছিঁড়ে আত্মরতিহীন যৌন মখমলের গালিচা পার হয়ে নির্মল বীজের থেকে ক্রমাগত পূর্ণরুপান্তরিত মহিলা হয়ে উঠছো?সালের বনে নির্বেদ শূন্যতা ঝরে পড়ে,ঝরে পড়ে ত্যক্ত বিপূলতা-যোনির শিখরে এতো রক্তপাত?সায়াহ্নকাল অবধি উচ্চকিত নিনাদ-কেননা জন্মোৎসব জাগতিক প্রণালীর ভাষা।ঔদাসীন্যহীন মৃত্যুতে মঙ্গল কিংবা অমঙ্গল কোনোটাই নেই। শোকের ভাবানুষঙ্গে মেঘ তার শ্রাবণসমেত ঝড় এবং অবিরল বৃষ্টি ধারাসহ গড়িয়ে পড়ছে।প্রাপ্যের তালিকা থেকে কিছু বাদ পড়ে গেছে?ত্বক পরিচর্যাকারী ক্ষার,নৌ-রথ,সৈকত,সমুদ্রের সান্দ্র স্বর?ঢেউ আর বায়ুর বিহারে অন্ধকার রাতের রাশির ছকে সূর্যোদয়ের স্বভাব ছটা দেখেছিলাম।প্রতিপদের চাঁদ বনের ঠিকানা মিলিয়ে নিয়েছে।ভূ-লুন্ঠিত আলোর ভূমিকা ছিল অথচ উন্মাদ কলাকার মঞ্চ জুড়ে অন্ধকারের আবহ্ন চেয়েছিল।তা-কি ঠিক?তা-কি কুশীলবের প্রত্যাশা?ধুন্দুমার আলো ও ছায়ায়,ভাষা ও বল্কলে,ব্যথাবেদনার অস্তাচলে কাকে খুঁজে পেয়েছিলে?আজ,বায়ুভূক গ্রন্থগুলিই আমার কাছে ছুটে আসে পোষা বিড়ালীর মতো।বাদামী শরীর ভরে দেয় তার সাদা রোমে।অক্ষর ও কবিতায় ফুটে ওঠে রঙধনু,আশ্চর্য,উদ্ভাসিত সহাস্য শিশুর কন্ঠ,বাবার অসুখ আর মায়ের শিন্নিমানতে ক্ষেতজাঙাল,গ্রামের আলপথ,পিতৃ-পুরুষের কবরখানায় মুক্তির বাসনা।ভয়াবহতায় প্রতিটি স্বপ্নের রেখা কেটে গেলে ভূ-কম্পিত প্রাকৃতিক নারী-জেনে নাও,আমি পরান্মুখ নই।প্রাচীর-ফটকে যারা প্রবেশাধিকার পায় নি তাদের একজন আমি এবং আমার অস্তিত্ব গোধূলিবেলার আলোর মতোন ক্ষণস্থায়ী নয়। ৪৬. যে পাথরে বসে মিলনের সঙ্গীট গেয়েছো,---পাঁজরকাঁপানো বিরহের সঙ্গীত তার চে' সুমধুর ছিল?এখন শহর থেকে শহরের স্মৃতির মিনার সব ব্যথা-বেদনা মোচন করে খুলে দেয় অসম্ভবের কুলায় শ্বাপদ সুন্দর শ্যামলতা ও বুকের ধারাস্নাত জল,রক্ত।ক্লানি ছিল না কখনও।গোধূলির রঙের অন্তিম থেকে অন্তঃসারহীম আলো খুলে ফেলেছিল সমস্ত শরীর,অস্তীতির ঘট ভেঙে প্রতিধ্বনিবিহীন শূন্যতা মুছে লেঁপে ওঠে দু'টি শরীরের একীভূত প্রতিবিম্ব।জলসন্ধি কিংবা প্রতিফলিত হ্রদের জলে ছায়া ছিল না-গরিমাচূড়া,আভিজাত্যে জ্বলজ্বল করছিল বুজে-আসা কূয়া আর ভস্মময় পার্ক।দীর্ঘ চরাচর,---আরও দীর্ঘতর যবনিকার উত্থানে আড়মোড়া ভাঙে সিঁদুরমাখা পাথরখন্ড।পূর্বাপর স্মৃতিতে আমার চোখে জেগে ওঠে শুকতারা,হিমতারাসকল,আগুনপোড়া খড় এবং শ্মশানঘাটের কালশিটে পথ।চিতার রুপালী ছাইয়ের ভেতর কিছু কী গোপনচারিতা ছিল?আমাদের বস্তুবাচক বয়স কত হল---ছেঁড়া কাগজসমেত এইসব ভাবি আর আমার উঠোনময় ত্যক্ত সাপের খোলস হেঁটে যায় সাপের সন্ধানে।বলা হয় নি-নিথর এসে দাঁড়ানো মিথুনমুর্তি ঘোর কালঘুমে অবিচল ঋণী থেকে যায় ঘুমের ভেতর।নির্বাসিত ভাষার স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা তার জলীয় ফেনায় সহজ আশ্রয় পেতে দু'হাতের করপুট পেতে...কে কাকে আশ্রয় দেবে দুর্যোগের এই কালে?অতর্কিত গাছের শুকনো ডালপালা ছুঁয়ে তাদের ক্ষতের নীচে শস্যশরীর-সমস্ত শস্য ঝরে পড়ে চৈতালী বাতাসে। অতঃপর রমণী,হাজার আলোকবর্ষ নিঃশ্বাসে পাকা শস্যের বর্ণের মতো তোমার শরীরে স্বর্ণাভ-হলুদ ছটা-এই রাত্রি,আতুর আলোয় জন্মদাগ স্পর্শে কেবলই মনে হয়, 'ভুল এ-জন্মে প্রতিকারবিহীন দ্রুত ক্ষয়ে যাক।' ৪৭. হাতের ছাপের মূর্ত এই দেয়াললিপিকা;যার প্রতি ভাঁজে ভাঁজে মতিচ্ছন্ন মুখ ফুটে আছে,শোকাচ্ছন্ন হৃদয় ও দ্রাবিড় আঙুল-কোন কার্যপ্রণালীতে এটা শনাক্তযোগ্য?ঈশ্বর অবরোহী?সুর আর রক্ত?সূর্যপাত?বিসর্জন?অকাল্বোধন? গানের গভীর গলা থেকে উঠে আসে তোমার রক্তিম গ্রীবা।বিদায় বেলার শেষ রাগিণীতে তরল আগুন ছুঁয়ে দিয়েছিল আমিষরঙা শরীর।বিষের বোঁটায় সর্পগন্ধা-ছেয়ে আছে তোমার উঠোন। নৈঃশব্দ্যের চলচ্ছায়া,অবিশ্বাস ও অপরিণিত ভাষ্য এবং টীকাসমেত সরল মিথ্যে নিয়ে পৃথিবীর প্রান্তশায়ী জ্বলন্ত রমণী,সমস্ত বোধ ও চেতনার উর্ধ্বমুখে গতানুগতিক প্রথার বাইরে থেকে জেগে ওঠা সেই নীল অঘোর-বঞ্চণা অনভ্যস্ত বিক পেতে ধরে রাখি।আগুনে পোড়ে না।মোছে না জোয়ার জলে।প্রতি রোমকুপে ঘন তার সজীব সঞ্চারে।প্রতীকী অথচ আন্তরিক পরিত্রাণহীন রুপটান স্মৃতি-কোনও বিসর্জন নেই শুধু বিষাদের আবহে আকাশ ছেয়ে আছে। চুম্বনহীণ ঐ ঠোঁটে বিষধুতুরার নীল।কুহকিনী অন্ধকারে শুধু বেড়ে ওঠে নখ ও দাঁতের দাগ।তোমার বাহুর সুপ্ত ভাঁজে কতো নিথর শরীরে ভরে আছে।রোগা,ভীতু আলোতে ভুতুড়ে সাড়ে তিন হাত ছায়া,এতো বেশী অন্ধ হয়ে গেছো?কে তোমাকে ছোঁবে,আজ?পারাপারের সমস্ত নৌকা পুড়িয়ে এসেছো?সবরকমের অন্ধকার আজ এতো প্রিয় হল?ভেবেছো সমস্ত অপচ্ছায়া এই বিশালাক্ষী অন্ধকার গিলে নেবে?নিরন্তর প্রণয়ের মধ্যে প্রেতিনীর নাচ নেচে যাচ্ছো-মুহূর্তের বর্ষণে অতীতকাতরতা অবাঞ্চিত করে। তোমার গানের শব্দ লক্ষ্য করে যারা ছুটেছিল দিগ্বিদিক অজ্ঞানের ঘোরে-তাদের কঙ্কাল ইতঃস্তত পড়ে আছে,পথপ্রান্তে;তারা নিশীথস্নানের দ্বি-পদী রাশিমালার সুত্র বুঝতে পারে নি কিন্তু তুমি ঠিকই জানতে দেহমিলনের আবর্তিত সূত্র। সম-সাময়িক নিষ্ফলতার ভেতর সারারাত জেগে ভাঙা আকাশের গায়ে সময়ের অথর্ব তুলিতে পূর্ব্ভাদ্রপদ নক্ষত্র,রেবতী,কৃত্তিকানক্ষত্র,সপ্তর্ষিমন্ডল আঁলি এবং মুছে ফেলি রোহিণীনক্ষত্র,পুষ্যা ও অনুরাধানক্ষত্র।মুখের রেখার লেগে থাকে সিংহরাশি,কালপুরুষের ছায়া এবং নিঃশব্দ সময় কমে দূরত্বের পরিমাপ কেবল আকাশ ছুঁয়ে যায়। তোমার দু'চোখে সাঙ্কেতিক গুহাচিত্ররেখা,অপরিণত ভ্রূণের প্রসবের জটিলতা-প্রেম ও যৌনতা ভেঙে বিবর্তনের গুহায় উপবৃত্তাকার ব্রক্ষান্ডের ত্বকে মরণকালের নিস্তব্ধতা। গতি অবিচ্ছেদ্য তরল অগ্নির রিরংসায় কূটিল স্তনের বৃন্ত,উরুস্তম্ভ,জন্মদাগ কখন গ্রীবার তাপে ফেটে ওঠে-অপদেবতা মুক্তি ও ধর্মে,নিষেধের প্রবারণায় কখন ছুঁড়ে ফেলেছিল সতীচ্ছদ? তুমি গৌরী,কিশোরীকালের মন্ত্রে একদিন আমাকে আহ্বান করেছিলে। ৪৮. ব্যবহৃত পুকুরের জটিল শিয়রে হেলে পড়া তালগাছের ছায়ায় উড়ে আসা কাকের অক্ষর,চৈত্রদুপুরের ক্রোধ এবং আলস্যের অন্তর্দ্বন্দ্বে সমস্ত সোনালী বিভ্রমের চরে ভাষা ও বিচ্ছেদে ঐকান্তিক শরীরের তৃপ্তি ও সম্ভোজ্ঞ শেষে পরিত্যক্ত বাতিঘরের মতোন আমাকে নিঃশব্দে ছেড়ে উলঙ্গ বন্দরে নেমে যাও।দ্রুতগামী বুদ্বুদরেখা ও মুখোমুখি ঢেউ-রক্তে ভেজা,জ্বলন্ত সূর্যের কালো ছায়া-স্নায়ু ছেঁড়ে,শরীর বিদীর্ণ করে এবং ফিরে পাই রক্তের পরিশোধিত মদ।এই নাও,ভাঙা গ্লাস।যথেচ্ছ পরিবেশনে ঝাঁপ ফেলা অন্ধকারের দোকানে এতো মানুষের ভীড়?টেবিলে টেবিলে টুইস্টের টুংটাং,নারীর সঞ্চার,পুরুষের গলাবদ্ধ ফাঁসে সন্দেহের গান,গণিকার নিষ্প্রদীপ করতলে বাহুহীন ধরে গুপ্ত বিদ্যা,---চোরাডাক পৌঁছে যাক আত্মার গভীরে। নিশকৃতির চেয়ে দুর্দমনীয় আকাঙ্খা,সাবলীল শূন্যতা এমন করে ছড়িয়ে রয়েছে ক্ষরণের দিকে-এই গল্প,এই চক্রপরিক্রমায় সমস্ত ঋণ একদিন শোধ হয়ে যাবে?রাতের বিশ্বাসে যে গাছের নীচে পাশাপাশি শুয়ে নিঃশ্বাস শুঁকেছিলাম-তার ডালে উড়ন্ত পাখির বাসা;বহু ঝড়জলে এখনও অটুট।ছিঁড়ে নিতে চেয়েছিল বাতাস,রৌদের তাপের প্রয়োজন ছিল,বৃষ্টি ভিজিয়ে দিয়েছে,অবিনাশী ঝড় উড়িয়ে নেয় নি শুধু আমাদের ঘর পুড়ে গেছে,জ্বালিয়ে দিয়েছে বিচ্ছেদের নীল শিখা।ছাই ভস্ম ভেসে গেছে অকাল বর্ষণে। শূন্য কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।হয়ত-বা আরও কিছুকাল টিকে যাবে। ৪৯. মাংসাশী অন্ধকারের মধ্যে বিমূর্ত রুপের নারী যতো শক্ত করে বেধেঁছিলে বুকের কাঁচুলি------স্তনশীর্ষে স্পষ্টতর ধারাবাহিক শোকের অবিনাশী কীর্তিগাঁথা যৌন-নিঃশ্বাসের নীচে চাপা পড়ে যায়।রাত্রি ঘন শীত-প্রস্তুত এখানে একমুঠো ধর্ম,সিকি,আধুলি,---খুচরো পয়সার আশীর্বাদ।অনির্দেশ্য টানে সুদীর্ঘ নিষ্ফলতার পর অবচেতনার স্থির অবসাদে সূক্ষ্মতর কম্পাসকাঁটা,স্থিতিস্থাপক এবং উদাসিনী তোমার শূন্যতা-প্রেম ছিল কখনো?শীতার্ত প্রহরের ইচ্ছাকৃত অসময়ে দ্বিতীয় বেদনা সঙ্গীতের চেয়েও বাঙ্ময় কেননা প্রেম থেকে জন্ম নেয় স্থবির কন্ঠের সুর,মোহরাত্রি;যা স্বপ্নে দেখেছিঃপ্রেমের প্রকৃত করতল,চোখ এবং চুম্বনের শামুক পিছল দাগ-সোঁদাগন্ধ দুঃখ থেকে মুছে গিয়েছিলে কোন মুহূর্তে?বিচ্ছেদ কিংবা অনিবার্য আমাদের ব্যর্থ প্রেমে এতো দুর্গলিত ক্ষত?ছায়ার মতোন দীন,প্রাচীন শ্যাওলা ধরা মুখে নীল ফেনা পোড়া ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকে।নিশিরাতের প্রহরে প্রতি পলে খোঁজো স্পর্শসুখ?ব্রাক্ষ্মনিতম্বিনী,রাত নেমে আসুক পাহাড়জুড়ে,তারপর জেগে উঠুক বিরহ। অনন্ত বিরহ-বর্ণময়।সাপের চলার পথে অক্ষরহীনতা,ভুল পাঠ।নিরন্তর পাঠে জলের গভীরে নেমে জেনে আসি পোড়া এই মুখ পরস্পরাচ্যুত জলের আঘাতে কতক্ষণে নিঃশেষিত হয়? ৫০. প্রতিটি দৃশ্যের অন্তর্গত গোপন মুহূর্তে মেঘ ও সূর্যাস্তরেখা ঘিরে সরল আকাঙ্খা-আমি তোমাকে চেয়েছিলাম। শুদ্ধ চিত্রকলা,প্রতীকী ব্যঞ্জনা ও কাব্যভাষার সূক্ষ্ম শৈলী এবং আবৃত যোনীর নির্মোহের রাতগুলোতে প্রণয় অসম্ভব শ্লোক ও নির্মম কটাক্ষের জগতে বস্তুতঃ অবাঞ্জিত-ই থেকেছি,চিরদিন।নক্ষত্রখচিত রাত্রির আকাশ।একটানা দু;সহ বৈশাখে ডেকে গেছি কাকের কর্কশ স্বরে।রুক্ষ্ম তালগাছের মতোন অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে থেকেছো।রাতের প্রেতেরা চেটে গেছে শরীরের ত্বক,উন্মুক্ত পেট ও নাভী,উরুদ্বয়,সোনার কাঁচুলি খুলে জোড়া রাজহাঁসের বিমূর্ত ও ঘন রুপ নৈঃশব্দের মুখোমুখি মধ্যরাতের রতিশরীরে....শুধু কিছু অভিব্যক্তি ভেসে থেকেছে বাতাসে। কোথায় গিয়েছে যৌন-অহঙ্কার? শেষ কথন গল্পের শেষের অংশে এসে মনে হল অবিচ্ছিন্ন ফুলগুলো তত ভালো ছিল না যতটা আঙুলের ফাঁক গলে গড়িয়ে পড়েছে বসন্তরজনীর অনিঃশেষিত শোকতাপ।গতানুগতিক ক্লান্ত মুখচ্ছবির কবিত্ব কিংবা আমাদের আত্মউপলব্ধিতে বিস্ময়কর জন্মের প্ল্যাটফর্মেজোড়া প্রতীক্ষার সম্মিলিত আলো,অন্য প্রান্তে গন্ধমুষিকের দল;দাঁতে ধরে আছে ঔদাস্য,পলায়নের স্থিতিস্থাপকতা-দুই বিপরীত টানে বেড়ে চলে শূন্যতা ও দীর্ঘ রেললাইনের পাতজুড়ে বিধৃত আঁভা-গার্দের চায়াচিত্র। পশ্চিমের গন্তব্যে,সূর্যস্ত।সঙ্গীদলসহ সেদিকেই হেঁটে যাচ্ছ আর আমি ভিখিরির মতো সপ্রতিভ খুঁড়িয়ে চলছি পূর্বদিকে।সূর্যোদয়ে ধূয়ে নেবো মৃত পাখির ডানায় লেগে থাকা আমার পূরাণো সব প্রেমিকার প্রিয় ডাকনাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন