Powered By Blogger

শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

কবির প্রতিকৃতি:সরদার ফারুক

যখন আমরা একটা অস্থির সময় পাড়ি দিচ্ছি,মানুষের সু-কোমল মানবিক মূল্যবোধগুলো ক্রমেই ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে,সর্বগ্রাসী এক ধ্বস নেমে আসছে আমাদের ব্যক্তি,সংসার ও সমাজ জীবনে,প্রেমের চিরন্তন,শ্বাশত বাণী,রমণীর রমণীয় রুপ কোথাও আস্থা রাখা যাচ্ছে না;তখন কবি সরদার ফারুক গেয়ে ওঠেন:

এখানে দুঃসহ দিন,জলের অভাবে
গাছগুলো পুড়ে গেছে,ওখানে অনন্ত
ঝর্ণা বয়ে যায় ?

তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে পাঠকের মনে অদ্ভুদ এক ঘোর এনে দেয়। যখন তিনি বলেন:

আড়মেন্দি,ঢোল কলমির
ঝোপ পেরলেই হাইওয়ে
সব পথ গেছে
                  শহরের দিকে ।
কবির এ স্বগদোক্তি কি অনাগত ভবিষ্যতের বা নূতন পথযাত্রা্র দূরবর্তী হাতছানির না কি দুঃখী বাংলার চিরায়ত দারিদ্রপীড়িত গাঁ গ্রামের চিত্র:

গ্রামে ভাত নেই
শীতের কামড়,ছাড়া ভিটে
ভরে আছে তেলাকুচা ফুলে।

তীব্র সংবেদনশীল কবি সরদার ফারুক সচেতনভাবেই হতাশ নন।ভাবালুতায়ও তিনি আক্রান্ত নন,নন মধ্যবিত্ত্ব পলায়নী মানসিক প্রবৃত্তির।সমাজ সচেতন ও মানবপ্রেমিক কবি সরদার ফারুকের রয়েছে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার প্রতি   সীমাহীন অভিমানঃ

..................
..................
পথ থেকে সরে গিয়ে বিপথেই হাঁটি
পাথরে পাথর গেঁথে ভাঙ্গি স্থাপত্যের
যাবতীয় পূরনো ধারণা
এক তুমি নির্বাসন বলো
বলো উন্মার্গগমন

অন্তর্গত অন্ধকারে থাকি
এইতো আমার অমল ক্যাথারসিস
(ক্যাথারসিস)

কবি সরদার ফারুকের কবি সত্ত্বায় আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব সক্রিয়ভাবে বিদ্যমান।পক্ষাঘাতগ্রস্ত মধ্যবিত্ত্বের জীবনবৃত্তে তিনি কখনো থেমে থাকেন নি বা আত্ম-সমর্পণ করেন নি।আত্মধিক্কারে তাঁর হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে,প্রবল সংশয়ে আচ্ছন্ন হয়েছেন কিন্তু সংশয়ে সুস্থিত হন নি।সংশয়বাদী কবি তিনি নন,আশাবাদ তাঁর মজ্জাগত:

গান গাইবার কালে কন্ঠ চিরে গেলে
আর্তনাদ বলে মনে হয়
পারো যদি মুছে ফেলো
নিঃসঙ্গ পথের চিহ্ন,রক্তঝরা দিন।
(সজারুর অবয়বে)

কিংবা মানুষ কবিতায়ঃ

এইভাবে হয়ে ওঠো,হয়ে ওঠো নিজের ভেতরে
বেড়ে ওঠো রক্তবীজ,অবাঞ্জিত ভ্রুণ
ফুটে ওঠো অনায়াসে কিশোরীর গোপণ কোরক

অদম্য আশাবাদী কবি সোনালী ভবিষয়ৎকে দেখেন অন্তর্দৃষ্টি মেলে :

.............
দলে দলে মানুষেরা যাত্রা করে অদম্য সাহসে
নতুন ঠিকানা লেখে সুবাসিত নামে।
(এক্লোডাস)

কবি সরদার ফারুকের কবিতায় সমকালীন মানুষের বিচ্ছিন্নতার গভীর যন্ত্রণার আর্তনাদ শোনা যায়।যুগ-মানসের অস্তিরতা,অনিশ্চিত পরিবেশ,ব্যক্তি-জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণায় কবির হৃদয় বারং বার চঞ্চল হয়েছে।হতাশা,ক্লান্তি,নৈরাশ্য প্রসঙ্গেও বিচ্ছিন্নতা এসেছে তাঁর কবিতায় :

হেঁটে যেতে যেতে চোখে পড়ে
মে ফ্লাওয়ারের বৃষ্টি ভাজা গাছ,নিঃসঙ্গ টিলার
নীচে বুনোলতা,ঘাস ফড়িং,খরস্রোতা মনু নদী
অনেক পূরণো ব্রীজ।এই পথ কোথায় গিয়েছে
মিশে আছে আরো কিছু পথের বেণীতে
( মনু ব্রীজ)

সমাজ সচেতন কবি সরদার ফারুক সমকালীন জীবনের নানা অসঙ্গতি ও অনাচারে পীড়িত হয়েছেন,যুগের অন্ধকারে তিনি গা ভাসিয়ে দেন নি।ব্যক্তিজীবনের ব্যর্থতা,সমাজ জীবনের একাকীত্বকে তিনি পরাবাস্তববাদী কবিতা রচনা করে মানুষের বিভঙ্গ ও অসহায়জীবনের একাকীত্বকে রুপদান করেছেন সফলভাবে।এখানে তিনি দক্ষ কুশীলব:

ভগ্ন এক প্রাসাদের ক্লান্তি
ভর করে ঘোড়ার শরীরে
রিংমাষ্টার,চাবুক দেখিয়ে
কোন লাভ নেই

ভীষণ গম্ভীর ভাঁড় দার্শনিক সেজে
শিষ্য পরিবৃত
দড়ির খেলায় শুধু বয়স্কা রুপসী
শিরা ওঠা হাতে
আকড়ঁ ধরেছে জোরে অদৃশ্য দেয়াল
(সার্কাস)

কবি সরদার ফারুকের মস্তিষ্ক প্রসুত অবচেতনের প্রতীকগুলো ভেসে অপূর্ব এক নান্দনিক তাৎপর্য্যে;যার ফলে পাথরের পাখিকে তিনি আকাশে উড়ে যেতে দেখেন।সত্যানুসন্ধানী এ কবি প্রকৃত বাস্তবকে উন্মোচনের জন্যে পরাবাস্তববাদী চেতনায় কবিতা রচনা করেন। এ পরাবাস্তব চেতনা তাই তাঁর কবিতার নন্দন্তত্ত্বের অপরিহার্য্য অংশ হয়ে ওঠে।নিসর্গ সৌন্দর্য্য ও আত্ম-অনুভবের অনুভূতি দিয়েই কবি সরদার ফারুক তাঁর কবিতার অবয়ব গড়ে তোলেন। তাঁর আত্মজ ভালোবাসা ও সৌন্দর্য্যতৃষ্ণা কবিতার প্রতিটি বাক্যে,প্রতিটি শব্দে।নন্দঞ্চিন্তার বীজ বপণ করেন একজন প্রকৃত শব্দচাষার মতোনই;যার ফলে কবিতার অকর্ষিত ভূমি থেকে তুলে নেন অপার প্রাচুর্য:

রেলপথ ধরে হেঁটে গেলে
ছোট কালভার্ট
অগভীর জলে খেলা করে
ডানকানা মাছ
তারপর তোমাদের বাড়ী

তুমি থাকো ভিতরের ঘরে
নীল জামা বাইরে শুকায়

আনন্দ কোথায় তুমি কবি সরদার ফারুকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ।তিনি তাঁর প্রথম বইয়ের মাধ্যমেই বাংলা কবিতায় ঠাঁই করে নিয়েছেন।যদিও হোঁচট খেতে হয় নামকরণের হেতু কি?যদিও জানি এ নামে তাঁর একটি কবিতা রয়েছে। বাংলা কবিতায় সরদার ফারুকের আগমন এমন এক সময়ে যখন সাইবার কল্যাণের কারণে রদ্দিমার্কা কবিতায় পথ হাঁটা দুষ্কর।উনি সযতনে সমস্ত কাঁদা-পাক এড়িয়ে পূর্বসুরী জীবনানন্দ,বিনয় মজুমদারের পথে হাঁটছেন।কবিতার বিচরণক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ সার্থক হোক।

কবি সাবরিনা সিরাজী তিতিরের 'মেঘ হয়ে যাই':উত্তরাধুনিক চেতনায়

ক্ষমতাসীনেরা সেই অতি প্রাচীনকাল থেকেই ক্ষমতার অতি প্রয়োগ ও অপব্যবহারের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যুদ্ধ,অশান্তি,দুর্নীতি,ঘৃণা ও বৈষম্যের সৃষ্টি করে জনজীবনে অশেষ দুর্ভোগ ও ভোগান্তির কারণ ঘটিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় তথা সমস্ত বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।প্রাচীন কালের বর্বরতা ও অদৃষ্টবাদী সমাজ ব্যবস্থা,মধ্যযুগীয় কু-সংস্কার ও অন্ধকার পেরিয়ে য়্যরোপে শিল্প-বিপ্লবের মাধ্যমে যে আধুনিকতার সুচনা হয়েছিল;শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্বে তা কার্য্যত ব্যররথ।ক্ষুধা,দারিদ্র্য,যুদ্ধ,নিষ্ঠুরতা,অশিক্ষা,জীবন ধারণে অনিশ্চয়তা মুক্ত করতে পারেনি আধুনিকতাবাদ।চরম হতাশা ও গ্লানি,মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে উত্তরাধুনিকতার জন্ম। মানব কল্যাণের আশাবাদ ও সদিচ্ছায় দৃঢ় প্রত্যয়ী উত্তরাধুনিকতা বাদ ; যা নিছক একটি মতাদর্শ নয়। আধুনিকতাবাদের মরনোন্মুখ আর্তনাদ ও উত্তরাধুনিকতা বাদের সাবলীল যাত্রায় কবি সাবরিনা সিরাজী তিতি্র তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'মেঘ হয়ে যাই' এ ব্যর্থ আধুনিকতা নিয়ে সীমাহীন ক্ষোভ নিয়ে লেখেন:

অবাক হই!মুখোসগুলো কেমন মানিয়ে যায় তোমাদের!
ক্রোধের ঘরে আস্তানা গড়ে মোনালিসা'র রহস্যময় হাসি,
কান্নাকে তালা দিয়ে চাবী তুলে দাও অট্টহাসির হাতে;
আবার নোংরা খিস্তি আড়াল হয়ে যায় তৈলাক্ত মুখোসে।
ব্যাকডেটেড মুখোসগুলো কি করবো আমি?
ভাবছিলাম কিছু পালটে হাল আমলের কিনবো
প্রয়োজনে একটা কিনলে আর একটা বিল্কুল ফ্রি।
গোপন একটা সত্যি বলি?
মুখোস পরতে পরতে মুখটা কেমন
ইট চাপা ঘাসের মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে
একটু সোনারোদ ছোঁইয়ার জন্য আকুলি বিকুলি করে বুকটা,
আয়নায় খুঁজে ফিরি নিজেকে,কতদিন নিজেকে দেখি না ।
(মুখোস)

আমরা এমন এক ভীতিপূর্ণ সময়ে বাস করছি যে উন্নত বা ক্ষুদ্র রাষ্ট্রেরও এমন সব ভয়ংকর মারণাস্ত্র রয়েছে যা পৃথিবীটাকে ধ্বংশ করে দেয়ার জন্যে যথেষ্টরো বেশী। আধুনিকতাবাদ আমাদের উপহার দিয়েছে সন্ত্রাসের আবহাওয়া ও আতংকের পরিমন্ডল, অস্থিতিশীলতায় পরিপূর্ণ বিশ্ব এ অবস্থায় আশাবাদ নিয়ে এগিয়ে চলছে  উত্তরাধুনিকতাঃ

আজ খুব ইচ্ছে করে জানো,
চেস বোর্ডে রাণীর মতো তোমাকে আগলে রাখবো,ভালবাসবো
প্রয়োজনে হাত ধরবো মৃত্যুর
( প্রিয় কে)

উত্তরাধুনিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল স্বাধীনতা।আধুনিকের কৃষ্ণবিবরে পাঠক ছিল পুরোপুরি লেখকের আজ্ঞাধীন।উত্তরাধুনিক সাহিত্যের ভেতর পাঠক পুরোপুরি স্বাধীন।পাঠকের ভূমিকা এখানে ঊন বা বহিরাগত নয় অন্তর্গত :

দুই দুয়ারী ঘরে বসত আমার।
এক দুয়ার পাহারা দেয় দুঃখ
অন্যটায় সুখের পাহারাদার
ইচ্ছেমাফিক ঢোকার নেই উপায়---
হাজারো প্রশ্ন।
(দুই দুয়ারী)

সময়ের এক অবাস্তব যাদু দিয়ে গড়া আজকের এ পৃথিবী।বাস্তবতা বেরিয়ে যায় আঙ্গুলের ফাঁক গলে।প্রকল্পনার স্বচ্ছ চাঁদরে ঢাকা পড়ে যায় যাবতীয় তথ্য ও তত্ত্ব।কূটাভাস থেকে কূটাভাসেই যার পরিভ্রমণ।তারুণ্যদীপ্ত অভিজ্জানে ছদ্ম এ সময় বিষদাঁত বিধিয়ে রাখে।ঊষর পৃথিবী ধরা  দেয় উত্তরাধুনিক চেতনায়ঃ

নামহীন অখ্যাত নদীটা তোমার দেয়া নাম পেয়ে---
লাজুক ভালোবাসায় আরও সিক্ত হয়েছিলো।
শান্ত নদীর হটাৎ জোয়ার,অন্যদের মতো তুমিও বুঝতে পারোনি।
চুপচাপ নদীর অসময়ের উচ্ছ্বাস,ভ্রু কুঁচকেছে অনেকের
(ডাকো প্রিয় নাম)

কবিতার অমোঘ শক্তি।মানুষকে কবিতার কাছেফিরতেই হয়।নানাবিধ বিবর্তণের মাধ্যমে আমাদের এখনকার এ উত্তরাধুনিকতা।কবি সাবরিনা সিরাজী তিতির উত্তরাধুনিকতাকে ধারণ করতে চেয়েছেন বাস্তবের উর্ধ্বে আরেক বাস্তবে উপনীত্র হয়ে।প্রকৃত বাস্তবকে তিনি প্রবল্ভাবে অবল্ম্বন করেই কবিতা বিনির্মাণ করেন :

অমাবস্যা বায়না করেছে সূর্য দেখবে ;ওকে খুশী করতে
রাতের সেই সূর্য রঙের টিপ আজও খোলা হয় নি
তবুও অমাবস্যা চোখের কাজল হয়
একসময় নিশ্চয়ই সূর্য ঘুমবে
অমনি অমাবস্যা ছুঁইয়ে দেবে তাকে
জ্বলে মরবে জানে তবুও চাতক হবার তৃষ্ণা
(সূর্য রঙের টিপ)

কবি অমিতাভ দাশের 'একমনা রোদ':উত্তরাধুনিক দৃষ্টিতে

রবীন্দ্র যুগের রোমান্টিক ধারার বিরোধীতা করেও তাঁর দৈশিক ও বৈশ্বিক ভাবনা,চিন্তন,মেধা ও মননশীলতা অনুসরণ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধে কিছু তরুণ কবি নূতন ধারার এক কবিতা চর্চা শুরু করেন;যা আধুনিক কবিতা ( যার সূচনাকাল ১৯২৫ সাল)।এ আধুনিক কবিতার ফর্ম বা কনটেক্সট তড়তড়িয়ে এগিয়ে চলে অর্ধ শতাব্দী কালেরও কিছু বেশী সময়। তারপর বাংলা তথা বিশ্ব কবিতার ইতিহাস এক দীর্ঘ বাঁক নেয়;এর নাম উত্তরাধুনিকতা।এ উত্তরাধুনিক শব্দটি সম্পর্কে অনেকের দ্বিমত,বিভিন্ন তাত্ত্বিকের নানাবিধ বিশ্লেষণ,এর সার্বজনীন ব্যাখ্যা বা গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে নানা তর্ক-বিতর্ক প্রতিনিয়ত চলে আসছে এবং প্রায় তিন দশক কালেরও অধিক সময়ব্যাপী হয়ে এল এ তর্কের মীমাংসা এখনো শেষ হয় নি অর্থাৎ আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি কবিতার অবস্থান। আধুনিক না-কি উত্তরাধুনিকতায় অবস্থান;যুগ মানসের এ দোদ্যুলময়তায় সন্দিহান কবি অমিতাভ দাশ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'একমনা রোদ' এ বলেন:
নির্জনতারও এক ছায়া আছে জানো ?
একলা রাস্তার,যে ছায়া মাটির গভীরে প্রোথিত
পাথরে পাথরে ? সেই তার মতো!
(নির্জনতার ছায়া)

সময়ের পাগলা ঘোড়া অবিরাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সর্বনাশা যমুনার একপাড় যখন পলিমাটিতে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হচ্ছে অপর পাড়ে তখন চলছে ভাঙ্গনের প্রলয় নাচন।রাক্ষুসী যমুনা গিলে খাচ্ছে নদীতীরের উদ্যমী সাহসী কৃষকের শেষ সম্বল বাস্তভিটে,হাট-বাজার,উপসানালয়,পাঠশালা।ভাঙ্গাগড়ার এ খেলার নামই কি জীবন।মানুষের ইতিহাস পর্য্যালোচনা করলে দেখতে পাই ভাঙ্গা-গড়ার অপরুপ চিত্র।যে সময় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত,সময়াজতন্ত্র বিপর্যস্ত ধনতান্ত্রিকতায় ঠান্ডা স্নায়ুযুদ্ধে সংকটগ্রস্ত বন্ধ্যা পৃথিবীতে উত্তরাধুনিকতার বীজ রোপিত হয়েছিল।সেই পাতার ফাঁকে ফাঁকে খেলা করছে চিকচিকে রোদ্দুর,রং-বেরঙএর পাখ-পাখালির কল-কাকলীতে মুখর বৃক্ষের ডালগুলো:

ঢেউয়ের ওপর ঢেঊ উঠেছে
চোখের পলক চিবুক ছুঁইয়ে
আকাশকে সম্রাট করেছে
রাম-ধনুকের রঙ ফুটেছে সলাজ আভায়
এক সমুদ্র ভালোবাসায় তীর ছুঁয়েছে.....
(এক সমুদ্র ভালোবাসায়)

উত্তরাধুনিকতা একটি বাস্তবতা। উত্তরাধুনিক কবিগণ মেধায় ও মননে বলিষ্ঠ। প্রথাবিরুদ্ধ ও শেকড়াশ্রয়ী কবিতা নিনির্মাণে চষে বেড়ান ইতিহাস,বেদ,পূরাণ,মহাভারত,চর্যাপদ,মধ্যযুগীয় গীতিকবিতা কিংবা পূর্বসুরীদের কাব্য:

পাখির নীড়ের মতো আশ্রয়ী চোখ আছে যার---
সে যখন
এমন আপন করে;
দারুচিনি পাতা মোড়া রিনরিন রিনরিন সুরে
বাঁশিতে বলেন----
''এতোদিন কোথায় ছিলেন?''
(এতোদিন কোথায় ছিলেন)

উত্তরাধুনিক কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য একরৈখিকতার কেন্দ্রকে গুড়িয়ে দিয়ে বহুরৈখিক কবিতা বিনির্মাণের প্রয়াসে কবি অমিতাভ দাশ সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন :

..........
আর বাংলা থেকে বহুদূরে এক আশ্রমে সারাদিন ধরে ঝরে পড়ে
টূপ টূপ টূপ--হলুদ গুলমোহর ফুল।এক শ্বেত পাথরের বিছানায়
শুয়ে আছেন চুপ দুই জ্যোতিষ্ক---শ্রী অরবিন্দ আর মাদার
ফিরতে ইচ্ছে করে না,শরীর ফিরলেও---মনের গভীরে যাবার
নিজেকে জানার,নিজেকে খোঁজার আধ্যাত্মিকতার আলের উত্তরাধিকার
(উত্তরাধিকার)

উত্তরাধুনিকতা বাংলা কবিতার নূতন দিগন্তের দরোজা মেলে ধরেছে।দু'শো বছরের ব্রীটিশ বেনিয়া আর চব্বিশ বছরের পাকি শাষণের বেড়াজাল থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নূতন এক বিশ্বাসের ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই নূতনের আয়োজন শুরু হয়েছে সবার অলক্ষ্যে।জন্মলগ্নেই উত্তরাধুনিকতাবাদ উপহার দিয়েছে ব্যক্তি-স্বাত্নত্র্যবাদ,শেকড়ের অন্বেষণ।উত্তরাধুনিকতাবাদীরা ষ্পষ্টতঃ দু'টি ধারায় বিভক্ত।একপক্ষ কবিতায় মানুষকে বাদ দিয়ে কবিতা রচনা শুরু করেন। তারা বলেনঃকবিতার কোন বিষয় থাকবে না;তা হবে শেকড় বিহীন পরগাছার মতোন।কবিতা হবে দুর্বেধ্য।কবিতার ভাষা হবে দুর্বেধ্য ও অপ্রচলিত শব্দে। আরেকদলের মতে কবিতার নির্দিষ্ট বিষয়বস্ত থাকবে,থাকবে মানুষ ও মানুষের ইতিহাস, কবিতা বিনির্মাণ হবে দেশজ,সহজ কিন্ত সস্তা নয় ও প্রচলিত শব্দের বহুমুখী রুপে। কবি অমিতাভ দাশ দ্বিতীয় পক্ষে :

বৃষ্টিতে হেঁটে যায়
স্বপ্ন ভাঙ্গা সে এক যুবক
বড় ক্লান্ত,বড় বেশী ক্লান্ত লাগে তাকে
(শ্রাবণঘন গহনমোহে)

কিংবা

একটি নিঃসঙ্গ নারী,তার নিঃসঙ্গ ঘরে নিঃসঙ্গ হয়েই
ছিল।তার নিঃসঙ্গ দুপুরের নিঃসঙ্গ পুকুরে
খট খট ক'টি নিঃসঙ্গ শব্দ ঢেউ উঠল---
(নিঃসঙ্গ)

আধুনিক জীবন খুব বেশী সহজ  নয়।পারিপার্শিক আবহমন্ডল এক ক্রমেই জটিল করে তুলছে। যান্ত্রিক সভ্যতা জীবনকে জটিল ও নিয়মের শৃংখলায় বেঁধে ফেওলতে চাচ্ছে। তাতে করে মানুষের জীবন বৈচিত্রহীন হয়ে পড়ছে,পড়ছে বর্ণহীন হয়ে। উত্তরাধ্নিকেরা সয়াতন ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে নৈরাশ্যবাদী হয়ে উঠতে পারে :

বৃষ্টি এলে শ্রাবণ আসে?
না,শ্রাবণ এলে আসে বৃষ্টি
কিছুতেই মনে পড়ে না আজ!

গন্তব্যে হারিয়ে গেছি যে ।
(গন্তব্যে হারানো)

কিংবা

সন্ধেবেলার ঘুন,---কেমন গভীর এক বিষন্ন বিপন্ন অন্ধকারে
ঘুম ভেঙ্গে ওঠা!জীবনটা কি হয়ে গেল হাসপাতাল এক
দেখতে-এল-না-এল-না কেউ এমন বিকেলে?
কেমন জানি ছল সূর্য্যাস্তটা ?
(সন্ধেবেলার ঘুন)

শনিবার, ২৮ মে, ২০১১

সমুদ্র

সমুদ্রের উপকূলে নিঃসঙ্গ গাঙচিল বলেছিলঃ
অনির্বান দুঃখ তাপ সমুদ্রের জলে নিঃশোষিত
হয় না তবুও কেন বারবার ফিরে আসো সমুদ্রের কাছে

নিঃসীম জলের সাথে আমাদের দেহের রক্তের
ঘনত্ব,উষ্ণতা সব একাকার সমুদ্রের জলের উষ্ণতা
ঘনত্বের সাথে ঘাম,চোখের পানির
স্বাদ সমুদ্দুরের জলের মতোনই নোনা

অস্তিত্বের খোঁজে ফিরে ফিরে আসি সমুদ্রের কাছে

২৭.০৫.১১
উত্তরা,ঢাকা।

বুধবার, ২৫ মে, ২০১১

সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত

শ্রাবনের অবিশ্বাসী জলে কি খুঁজছ
গতরাতে ধুয়ে ফেলা আত্মার সে পাপ
ভেসে গেছে তা দূর অতীতে
পড়ে আছে ছায়া জলের প্রচ্ছদে

সূর্যোদয়ে কোনো প্রত্যাশা কোরো না
বরঞ্চ এগিয়ে এসোঃ
উষ্ণ হই হৃদয়ে হৃদয় ঘষে
প্রজ্বলিত করি নিজেদের

২.
দিগন্তে কি খোঁজো
জেনে রেখোঃসূর্যাস্তের কাছে প্রার্থনা নিষ্ফল
চান্দ্রজ্যোৎস্নার আলোকে অবিশ্বাসী হয়ে যাও
অন্ধকারে পথ হারাবে না
সব পথই নিশ্চিত কোনো না কোনো গৃহের
দরোজায় গিয়ে শেষ হয়।

২৫.০৫.১১
উত্তরা,ঢাকা।

প্রজাপতি

সারা গ্রীষ্মকালটা সে কাটিয়েছে ফুলে ফুলে ডানায় পরাগ মেখে
উদ্দাম রোদের
মাদকতায় ডানায় চিকচিক করছিল ফুলের ডিম্বানু
নিষিক্তকরণ ভ্রুণ ফুলে পরিণত করেছিল
নিজের অজান্তে আর অবসরে শুনেছিল পাখ-পাখালির
চান্দ্রগীতি,---তারপর যখন তুষারে ঢেকে গেল
গোটা পৃথিবী,শুকিয়ে গেল বাগানগুলো,সমস্ত
ফুলগুলো ঝরে গেল,সূর্য ঢাকা পড়ে গেল মেঘের আড়ালে
হিম বাতাসে ছড়িয়ে গেল চারদিক বিষাদের
করুণ নিনাদ,শুভ্র চাঁদরে মুড়ি দিয়ে ঝিমোয় পৃথিবী

অতঃপর সে তখন খুঁজে নিল পাথরের এক গুহা এবং
তার হৃদয় বিদীর্ন করে বের হল
করুণতম ক্রন্দনঃহায়! ঈশ্বর গ্রীষ্মকালের
স্থায়ীত্ব স্বল্পায়ু কেন এত এবং তারপরেই সে
মুখ থুবড়ে পড়ল পাথরের মেঝে

২৪.০৫.১১
উত্তরা,ঢাকা।

সোমবার, ২৩ মে, ২০১১

কদর্য বিভৎসতা

কুয়াশার আস্তরণ গায়ে মেখে আলকাতরার
কালো,গাঢ় অন্ধকার তাড়াবার ব্যর্থ
চেষ্টায় ফুঁপিয়ে কাঁদে ল্যাম্পপোষ্ট নিঃসঙ্গ,একাকী
সম্ভাবনাময়ী ভোর দূর কোনো সুড়ঙ্গে ঘুমোয়
বিপ্লবী য্যানো এক স্বেচ্ছা নির্বাসিত

মশারীর জাল ফেঁসে স্বপ্নগুলো দিগন্তে লুকোয়
সর্বহারার অজেয় মনোভাবে মশাগুলো
লাল মিছিলে সামিল অকুতোভয়,সাহসী সু-শৃংখল সৈনিকঁদের
                                                            দৃপ্ত পদভারে
প্রকম্পিত রণাঙ্গন সামনে এগুনো ছাড়া য্যানো অন্য ব্রক্ষমন্ত্র
                                                          অজানা তাদের

ষ্ট্যাচু অব লিবার্টির উজ্জ্বল মশাল নিভু নিভু
                                                 আত্ম-ধিক্কারে,প্রবঞ্চণায়
অভিবাসী সামুদ্রিক অসুরেরা প্রবল প্রতাপে
উপকূলে জোটবদ্ধ বিভৎস কদর্যতার হাইব্রীড বীজ
ছড়ায় এশিয়া আফ্রিকায়
লাতিন মধ্যপ্রাচ্যের পথে পথে

আগুনে আগুনে জ্বেলে ভস্মীভূত হোক
কদর্যতার বিভৎস রুপ।

২৩.০৫.১১
উত্তরা,ঢাকা।