রবীন্দ্র যুগের রোমান্টিক ধারার বিরোধীতা করেও তাঁর দৈশিক ও বৈশ্বিক ভাবনা,চিন্তন,মেধা ও মননশীলতা অনুসরণ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধে কিছু তরুণ কবি নূতন ধারার এক কবিতা চর্চা শুরু করেন;যা আধুনিক কবিতা ( যার সূচনাকাল ১৯২৫ সাল)।এ আধুনিক কবিতার ফর্ম বা কনটেক্সট তড়তড়িয়ে এগিয়ে চলে অর্ধ শতাব্দী কালেরও কিছু বেশী সময়। তারপর বাংলা তথা বিশ্ব কবিতার ইতিহাস এক দীর্ঘ বাঁক নেয়;এর নাম উত্তরাধুনিকতা।এ উত্তরাধুনিক শব্দটি সম্পর্কে অনেকের দ্বিমত,বিভিন্ন তাত্ত্বিকের নানাবিধ বিশ্লেষণ,এর সার্বজনীন ব্যাখ্যা বা গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে নানা তর্ক-বিতর্ক প্রতিনিয়ত চলে আসছে এবং প্রায় তিন দশক কালেরও অধিক সময়ব্যাপী হয়ে এল এ তর্কের মীমাংসা এখনো শেষ হয় নি অর্থাৎ আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি কবিতার অবস্থান। আধুনিক না-কি উত্তরাধুনিকতায় অবস্থান;যুগ মানসের এ দোদ্যুলময়তায় সন্দিহান কবি অমিতাভ দাশ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'একমনা রোদ' এ বলেন:
নির্জনতারও এক ছায়া আছে জানো ?
একলা রাস্তার,যে ছায়া মাটির গভীরে প্রোথিত
পাথরে পাথরে ? সেই তার মতো!
(নির্জনতার ছায়া)
সময়ের পাগলা ঘোড়া অবিরাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সর্বনাশা যমুনার একপাড় যখন পলিমাটিতে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হচ্ছে অপর পাড়ে তখন চলছে ভাঙ্গনের প্রলয় নাচন।রাক্ষুসী যমুনা গিলে খাচ্ছে নদীতীরের উদ্যমী সাহসী কৃষকের শেষ সম্বল বাস্তভিটে,হাট-বাজার,উপসানালয়,পাঠশালা।ভাঙ্গাগড়ার এ খেলার নামই কি জীবন।মানুষের ইতিহাস পর্য্যালোচনা করলে দেখতে পাই ভাঙ্গা-গড়ার অপরুপ চিত্র।যে সময় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত,সময়াজতন্ত্র বিপর্যস্ত ধনতান্ত্রিকতায় ঠান্ডা স্নায়ুযুদ্ধে সংকটগ্রস্ত বন্ধ্যা পৃথিবীতে উত্তরাধুনিকতার বীজ রোপিত হয়েছিল।সেই পাতার ফাঁকে ফাঁকে খেলা করছে চিকচিকে রোদ্দুর,রং-বেরঙএর পাখ-পাখালির কল-কাকলীতে মুখর বৃক্ষের ডালগুলো:
ঢেউয়ের ওপর ঢেঊ উঠেছে
চোখের পলক চিবুক ছুঁইয়ে
আকাশকে সম্রাট করেছে
রাম-ধনুকের রঙ ফুটেছে সলাজ আভায়
এক সমুদ্র ভালোবাসায় তীর ছুঁয়েছে.....
(এক সমুদ্র ভালোবাসায়)
উত্তরাধুনিকতা একটি বাস্তবতা। উত্তরাধুনিক কবিগণ মেধায় ও মননে বলিষ্ঠ। প্রথাবিরুদ্ধ ও শেকড়াশ্রয়ী কবিতা নিনির্মাণে চষে বেড়ান ইতিহাস,বেদ,পূরাণ,মহাভারত,চর্যাপদ,মধ্যযুগীয় গীতিকবিতা কিংবা পূর্বসুরীদের কাব্য:
পাখির নীড়ের মতো আশ্রয়ী চোখ আছে যার---
সে যখন
এমন আপন করে;
দারুচিনি পাতা মোড়া রিনরিন রিনরিন সুরে
বাঁশিতে বলেন----
''এতোদিন কোথায় ছিলেন?''
(এতোদিন কোথায় ছিলেন)
উত্তরাধুনিক কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য একরৈখিকতার কেন্দ্রকে গুড়িয়ে দিয়ে বহুরৈখিক কবিতা বিনির্মাণের প্রয়াসে কবি অমিতাভ দাশ সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন :
..........
আর বাংলা থেকে বহুদূরে এক আশ্রমে সারাদিন ধরে ঝরে পড়ে
টূপ টূপ টূপ--হলুদ গুলমোহর ফুল।এক শ্বেত পাথরের বিছানায়
শুয়ে আছেন চুপ দুই জ্যোতিষ্ক---শ্রী অরবিন্দ আর মাদার
ফিরতে ইচ্ছে করে না,শরীর ফিরলেও---মনের গভীরে যাবার
নিজেকে জানার,নিজেকে খোঁজার আধ্যাত্মিকতার আলের উত্তরাধিকার
(উত্তরাধিকার)
উত্তরাধুনিকতা বাংলা কবিতার নূতন দিগন্তের দরোজা মেলে ধরেছে।দু'শো বছরের ব্রীটিশ বেনিয়া আর চব্বিশ বছরের পাকি শাষণের বেড়াজাল থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নূতন এক বিশ্বাসের ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই নূতনের আয়োজন শুরু হয়েছে সবার অলক্ষ্যে।জন্মলগ্নেই উত্তরাধুনিকতাবাদ উপহার দিয়েছে ব্যক্তি-স্বাত্নত্র্যবাদ,শেকড়ের অন্বেষণ।উত্তরাধুনিকতাবাদীরা ষ্পষ্টতঃ দু'টি ধারায় বিভক্ত।একপক্ষ কবিতায় মানুষকে বাদ দিয়ে কবিতা রচনা শুরু করেন। তারা বলেনঃকবিতার কোন বিষয় থাকবে না;তা হবে শেকড় বিহীন পরগাছার মতোন।কবিতা হবে দুর্বেধ্য।কবিতার ভাষা হবে দুর্বেধ্য ও অপ্রচলিত শব্দে। আরেকদলের মতে কবিতার নির্দিষ্ট বিষয়বস্ত থাকবে,থাকবে মানুষ ও মানুষের ইতিহাস, কবিতা বিনির্মাণ হবে দেশজ,সহজ কিন্ত সস্তা নয় ও প্রচলিত শব্দের বহুমুখী রুপে। কবি অমিতাভ দাশ দ্বিতীয় পক্ষে :
বৃষ্টিতে হেঁটে যায়
স্বপ্ন ভাঙ্গা সে এক যুবক
বড় ক্লান্ত,বড় বেশী ক্লান্ত লাগে তাকে
(শ্রাবণঘন গহনমোহে)
কিংবা
একটি নিঃসঙ্গ নারী,তার নিঃসঙ্গ ঘরে নিঃসঙ্গ হয়েই
ছিল।তার নিঃসঙ্গ দুপুরের নিঃসঙ্গ পুকুরে
খট খট ক'টি নিঃসঙ্গ শব্দ ঢেউ উঠল---
(নিঃসঙ্গ)
আধুনিক জীবন খুব বেশী সহজ নয়।পারিপার্শিক আবহমন্ডল এক ক্রমেই জটিল করে তুলছে। যান্ত্রিক সভ্যতা জীবনকে জটিল ও নিয়মের শৃংখলায় বেঁধে ফেওলতে চাচ্ছে। তাতে করে মানুষের জীবন বৈচিত্রহীন হয়ে পড়ছে,পড়ছে বর্ণহীন হয়ে। উত্তরাধ্নিকেরা সয়াতন ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে নৈরাশ্যবাদী হয়ে উঠতে পারে :
বৃষ্টি এলে শ্রাবণ আসে?
না,শ্রাবণ এলে আসে বৃষ্টি
কিছুতেই মনে পড়ে না আজ!
গন্তব্যে হারিয়ে গেছি যে ।
(গন্তব্যে হারানো)
কিংবা
সন্ধেবেলার ঘুন,---কেমন গভীর এক বিষন্ন বিপন্ন অন্ধকারে
ঘুম ভেঙ্গে ওঠা!জীবনটা কি হয়ে গেল হাসপাতাল এক
দেখতে-এল-না-এল-না কেউ এমন বিকেলে?
কেমন জানি ছল সূর্য্যাস্তটা ?
(সন্ধেবেলার ঘুন)
নির্জনতারও এক ছায়া আছে জানো ?
একলা রাস্তার,যে ছায়া মাটির গভীরে প্রোথিত
পাথরে পাথরে ? সেই তার মতো!
(নির্জনতার ছায়া)
সময়ের পাগলা ঘোড়া অবিরাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সর্বনাশা যমুনার একপাড় যখন পলিমাটিতে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হচ্ছে অপর পাড়ে তখন চলছে ভাঙ্গনের প্রলয় নাচন।রাক্ষুসী যমুনা গিলে খাচ্ছে নদীতীরের উদ্যমী সাহসী কৃষকের শেষ সম্বল বাস্তভিটে,হাট-বাজার,উপসানালয়,পাঠশালা।ভাঙ্গাগড়ার এ খেলার নামই কি জীবন।মানুষের ইতিহাস পর্য্যালোচনা করলে দেখতে পাই ভাঙ্গা-গড়ার অপরুপ চিত্র।যে সময় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত,সময়াজতন্ত্র বিপর্যস্ত ধনতান্ত্রিকতায় ঠান্ডা স্নায়ুযুদ্ধে সংকটগ্রস্ত বন্ধ্যা পৃথিবীতে উত্তরাধুনিকতার বীজ রোপিত হয়েছিল।সেই পাতার ফাঁকে ফাঁকে খেলা করছে চিকচিকে রোদ্দুর,রং-বেরঙএর পাখ-পাখালির কল-কাকলীতে মুখর বৃক্ষের ডালগুলো:
ঢেউয়ের ওপর ঢেঊ উঠেছে
চোখের পলক চিবুক ছুঁইয়ে
আকাশকে সম্রাট করেছে
রাম-ধনুকের রঙ ফুটেছে সলাজ আভায়
এক সমুদ্র ভালোবাসায় তীর ছুঁয়েছে.....
(এক সমুদ্র ভালোবাসায়)
উত্তরাধুনিকতা একটি বাস্তবতা। উত্তরাধুনিক কবিগণ মেধায় ও মননে বলিষ্ঠ। প্রথাবিরুদ্ধ ও শেকড়াশ্রয়ী কবিতা নিনির্মাণে চষে বেড়ান ইতিহাস,বেদ,পূরাণ,মহাভারত,চর্যাপদ,মধ্যযুগীয় গীতিকবিতা কিংবা পূর্বসুরীদের কাব্য:
পাখির নীড়ের মতো আশ্রয়ী চোখ আছে যার---
সে যখন
এমন আপন করে;
দারুচিনি পাতা মোড়া রিনরিন রিনরিন সুরে
বাঁশিতে বলেন----
''এতোদিন কোথায় ছিলেন?''
(এতোদিন কোথায় ছিলেন)
উত্তরাধুনিক কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য একরৈখিকতার কেন্দ্রকে গুড়িয়ে দিয়ে বহুরৈখিক কবিতা বিনির্মাণের প্রয়াসে কবি অমিতাভ দাশ সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন :
..........
আর বাংলা থেকে বহুদূরে এক আশ্রমে সারাদিন ধরে ঝরে পড়ে
টূপ টূপ টূপ--হলুদ গুলমোহর ফুল।এক শ্বেত পাথরের বিছানায়
শুয়ে আছেন চুপ দুই জ্যোতিষ্ক---শ্রী অরবিন্দ আর মাদার
ফিরতে ইচ্ছে করে না,শরীর ফিরলেও---মনের গভীরে যাবার
নিজেকে জানার,নিজেকে খোঁজার আধ্যাত্মিকতার আলের উত্তরাধিকার
(উত্তরাধিকার)
উত্তরাধুনিকতা বাংলা কবিতার নূতন দিগন্তের দরোজা মেলে ধরেছে।দু'শো বছরের ব্রীটিশ বেনিয়া আর চব্বিশ বছরের পাকি শাষণের বেড়াজাল থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নূতন এক বিশ্বাসের ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই নূতনের আয়োজন শুরু হয়েছে সবার অলক্ষ্যে।জন্মলগ্নেই উত্তরাধুনিকতাবাদ উপহার দিয়েছে ব্যক্তি-স্বাত্নত্র্যবাদ,শেকড়ের অন্বেষণ।উত্তরাধুনিকতাবাদীরা ষ্পষ্টতঃ দু'টি ধারায় বিভক্ত।একপক্ষ কবিতায় মানুষকে বাদ দিয়ে কবিতা রচনা শুরু করেন। তারা বলেনঃকবিতার কোন বিষয় থাকবে না;তা হবে শেকড় বিহীন পরগাছার মতোন।কবিতা হবে দুর্বেধ্য।কবিতার ভাষা হবে দুর্বেধ্য ও অপ্রচলিত শব্দে। আরেকদলের মতে কবিতার নির্দিষ্ট বিষয়বস্ত থাকবে,থাকবে মানুষ ও মানুষের ইতিহাস, কবিতা বিনির্মাণ হবে দেশজ,সহজ কিন্ত সস্তা নয় ও প্রচলিত শব্দের বহুমুখী রুপে। কবি অমিতাভ দাশ দ্বিতীয় পক্ষে :
বৃষ্টিতে হেঁটে যায়
স্বপ্ন ভাঙ্গা সে এক যুবক
বড় ক্লান্ত,বড় বেশী ক্লান্ত লাগে তাকে
(শ্রাবণঘন গহনমোহে)
কিংবা
একটি নিঃসঙ্গ নারী,তার নিঃসঙ্গ ঘরে নিঃসঙ্গ হয়েই
ছিল।তার নিঃসঙ্গ দুপুরের নিঃসঙ্গ পুকুরে
খট খট ক'টি নিঃসঙ্গ শব্দ ঢেউ উঠল---
(নিঃসঙ্গ)
আধুনিক জীবন খুব বেশী সহজ নয়।পারিপার্শিক আবহমন্ডল এক ক্রমেই জটিল করে তুলছে। যান্ত্রিক সভ্যতা জীবনকে জটিল ও নিয়মের শৃংখলায় বেঁধে ফেওলতে চাচ্ছে। তাতে করে মানুষের জীবন বৈচিত্রহীন হয়ে পড়ছে,পড়ছে বর্ণহীন হয়ে। উত্তরাধ্নিকেরা সয়াতন ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে নৈরাশ্যবাদী হয়ে উঠতে পারে :
বৃষ্টি এলে শ্রাবণ আসে?
না,শ্রাবণ এলে আসে বৃষ্টি
কিছুতেই মনে পড়ে না আজ!
গন্তব্যে হারিয়ে গেছি যে ।
(গন্তব্যে হারানো)
কিংবা
সন্ধেবেলার ঘুন,---কেমন গভীর এক বিষন্ন বিপন্ন অন্ধকারে
ঘুম ভেঙ্গে ওঠা!জীবনটা কি হয়ে গেল হাসপাতাল এক
দেখতে-এল-না-এল-না কেউ এমন বিকেলে?
কেমন জানি ছল সূর্য্যাস্তটা ?
(সন্ধেবেলার ঘুন)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন