বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৪
পান্ডুলিপি আলোচনাঃনা মানুষ/কুহক মাহমুদ ।
লিকলিকে শীর্ণদেহ,উস্কোখুসো চুঁড়াবাঁধা চুল,অযত্নে বেড়ে উঠছে দাঁড়ি-গোঁফ।কী শীত,কী গ্রীষ্ম গায়ে চাদর, কাঁধ থেকে ঝুলছে ল্যাপটপ,ক্যামেরার ব্যাগ । প্রথম নজরেই বলে দেয়া যায় লোকটা উন্নাসিক,ভাবুক - শিল্পসৃষতির প্রয়াসে উন্মুখ ।কাঁটাবন, কনকর্ড এ্যাম্পোরিয়ামের পরিচিত ও প্রিয়মুখ কবি কুহক মাহমুদের কথা বলছিলাম ।চা-সিগারেটের সাথে আড্ডা চলছিল অনুপ্রাণন প্রকাশনীর অফিসে । টেবিলের কাগজ-পত্র নাড়াচাড়া করতে করতে হাতে উঠে এল ষ্ট্যাপলড করা একতাড়া কাগজ।উল্টে-পাল্টে দেখি একটি পান্ডুলিপি,কুহক মাহমুদের 'না মানুষ'। পড়তে গিয়ে একটি কবিতায় চোখ আটকে গেলঃ
সুরহীন সুরায় জাহ্নবী দিনের মতো বুঁদ হয়ে আছি
দৃশ্যপটটি এখানেই শেষ হতে পারতো হয় নিঃ
অবশিষ্ট সংলাপগুলো অবাধ্য বাদুড়ে ডানায় উড়ছে
সে-এক কানা বাদুড়
আবিষ্কার করতে চাইছে পালঙ্কের ইতিহাস
গঞ্জ কী করে হলো,নগর ঔপনিবেশিক বা আবাস
(মায়া)
কবিতাটি পড়ে মনে হলো ভাববাদী দর্শনের প্রভাব আবছা হলেও আছে এবং ফল্গুধারার মতো তাঁর কবিতার অন্তঃসার - বৈরাগ্যের এক প্রতিভা । তাঁর কবিতার প্রকাশভঙ্গি আবেগময় এবং দূরন্ত বেগের কিন্তু এতে উচ্ছ্বলতা নেই আছে পরিমিতির নিপূণ মাত্রা । তিনি সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সার্বক্ষনিক প্রস্তুতির অবস্থায় রাখেন । এ পান্ডুলিপির অর্ধেকেরও বেশী কবিতা প্রতীকধর্মী । প্রতীকবাদ তর্কের যদিও মীমাংসা হয় নি তবুও উপযুক্ত প্রতিভার হাতে প্রতীক স্বার্থক ও জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে । এক্ষেত্রে কুহক মাহমুদের প্রতীকগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সেগুলো প্রগাঢ়ভাবে ব্যক্তিগত আর নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে অর্থাৎ একটি ভাব বা ভাবনা বা আবেগের জন্যে কবি প্রতীক ব্যবহার করেছেন - সে জন্যে কখনও কখনও কিছুটা দূর্বেধ্য মনে হয়েছেঃ
..........
..........
..........
হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত,ঘুম ভেঙে আসে চোখের পাতা
মা-মাটি নদীর পৈঠায়,দুঃস্বপ্নের চিৎকার ভাসে
ভোরের সূর্য পৈঠায়,দুঃস্বপ্নের চিৎকার ভাসে
ভোরের সূর্য্য ঢেকে দেয় বাদুড়ের ঝাঁক
ধ্বংসস্তুপে শুনি বিড়াল কান্নার দীর্ঘ বিলাপ
কাকনের পকেটে প্রশ্ন জাগে
কোথাও নেই তুই!
(রাজপথ)
কুহক মাহমুদ আত্ম-জৈবনিক,রোমান্টিক একজন কবি।আজন্ম শিল্প-তৃষিত কবি শিল্প-চেতনাকেই নান্দনিকতার মূল উৎস বলে মনে করেন।মানবজীবনের মহত্ত্বম উপলব্ধি হছে প্রেম আর তাই তাঁর কবিতায় প্রেমের স্থান অবশ্যম্ভাবী।স্বতন্ত্র, নান্দনিক শৈলী,চেতনা ও নন্দনতাত্ত্বিক দার্শনিকবোধের কারণেই তাঁর কবিতা সৌন্দর্য্য চেতনাকে স্পর্শ করে কাব্যিক চেতনায়,সত্ত্বার গভীরতর আবেগের কল্পনায় সীমার মধ্যে অসীমের স্পর্শ সঞ্চরনশীল;যা প্রেম চেতনার সঙ্গে নন্দনতত্ত্বের নিবিড় সংযোগে প্রেমকে চিত্রিত করেছেন সর্ব প্রসারীরুপে প্রতীকের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন অতি-প্রাকৃত আরেক প্রতীকঃ
তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি,কিন্তু
ঐ তির্যক চাহনী
নির্জন নীরবতায় মৌন পাথর!
অপুষ্ট আনি-
সেখানে শুধুই শিল্প পেয়েছি
নির্নিমেষ তাকিয়ে মাংসের ভেতর ঢুকে স্পষ্ট
প্রত্যেকটা হাড়ের সংখ্যা গুনে ভালোবেসেছি
মমতার জানালা খুলে ঘরে খিল এঁটেছি
আমি এক না মানুষ,নিমন্ত্রণ রাখলাম
একদিন এসোঃ
পাল তোলা সাম্পানের পাতাতন হবো-
(পাঁজরের খোঁড়লে ভালোবাসা)
নিরন্তর প্রস্তুতির মাঝে নিজেকে ধরে রেখেছেন কবি কুহক মাহমুদ । সমকালকে তিনি মেপে চলেছেন মহাকালের বাটখারায় তাই তাঁর কবিতায় দেখি সৃষ্টিশীলতার বহুবর্ণা ঔজ্জ্বল্য ঠিকরে বেড়িয়ে আসে কবিতার লাইন ফুঁড়ে।আত্ম-চেতনা ও সৃষ্টির বিপুল আনন্দে আত্মহারা এ কবি পূর্বসুরীদের গতানুগতিক ভাবধারা সযত্নে এড়িয়ে চলার লক্ষ্যনীয় প্রয়াসে লিপ্ত । প্রথাগত আনন্দের ঝলকানি,বেদনার বিষাদাত্মক যন্ত্রণা কিংবা বাস্তবতার নিরেট পাথরও তাঁর কাছে গুরুত্ব বহন করে না । সৃজনশীলতার চরম উৎকর্ষে থেকে তিনি বিনির্মাণ করেন কবিতা;পৃথক ও স্বাতন্ত্র্যবোধের অভিনব ভাব,ভাষা ও বক্তব্যে উপস্থাপিত দ্বন্দ্বে ভরা এক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় পাঠক হৃদয়ঃ
রাতের ঘুম ভাঙিয়ে দিলো জোছনার স্রোত
ফিরে চাইতে,তোমার নামে দেয়া অর্ঘ্য ।
হয়ে ওঠে না কিন্তু মনে পড়ে যায়
ছড়ানো ফুল কুড়িয়ে যে যুবকটি পুরুষ হয়ে ওঠে
সে বোঝেনি,ঠিক কোন সুরে বেঁধেছিলে
মন্ময়?হারানো বিচ্ছেদ । একজন বৃদ্ধ তবু জপে যায়
হরে কৃষ্ণ নাম!ঈশ্বরের কাতারে দাঁড়িয়ে থাকে এক না-মানুষ
বিমু রসায়নে উজ্জীবিত বিপর্যস্ত হাইড্রা ফানুস
(অভিকর্ষ)
উত্তরাধুনিক মানুষ ছুটে চলেছে এক মহাশূন্যাত্র দিকে,অসীমতার দিকে ধাবমান,বিছিন্নতাবোধে আক্রান্ত একদল মানুষ । উত্তরাধুনিক মানুষ তার সীমাবদ্ধতা জানে কিন্তু মানতে চায় না অথচ সীমা লঙ্ঘন তার পক্ষে দুঃসাধ্য । ফলে জন্ম নেয় মনোজাগতিক এক দোদ্যুলময়তা । এর শুরু গত শতাব্দীর দু দু'টো অর্থহীন মহাযুদ্ধ মহাযুদ্ধ মানুষের চিরন্তন মৌল বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে চিন্তা চেতনার জগতে আনে ব্যাপক পরিবর্তন । মানুষ ক্রমেই ঈশ্বরবিমুখ হতে শুরু করে সামাজিক রীতি-নীতি প্রহসনে পরিণত হয়,ভেঙে যেতে থাকে যুথবদ্ধ পরিবার । মানুষ ক্রমেই নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে পড়ে তদুপরি পুঁজিবাদী সর্বগ্রাসী আগ্রাসনে মানুষের ব্যক্ত-সচেতনাতা,ব্যক্তি-স্বাধীনতার সমস্যা ও সংকটের যন্ত্রণায় মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিচ্ছিন্নতাবোধে জর্জরিত হতে থাকেঃ
.........
.........
.........
বৈশ্বিক বেশ্যা হয়ে তবু আমি সুখী-
কচ্ছপের বর্ম বুকে বেঁধে বেঁচে আছি!
এক না মানুষ-
প্রতিটা রাত শেষের জন্মে পাই সাপের শরীর,সুদেষ্ণার ভাসান
তোমরা মানুষ হয়ে থাকো গো রাই,সংসারী রথের উঠোন!
(হতে পারতো কিন্তু হয়নি)
প্রবল আশাবাদই কবি কুহক মাহমুদের কবিতার উপজীব্য ।প্রেম চেতনার কবিতায় থাকে না কোনো কেন্দ্রীয় উপমা,প্রথাগত চিত্রকল্প । নিপূণ।নিঁখুত শব্দের বুননে নান্দনিক অনুভূতিতে বিনির্মাণ করেন কবিতা;যাতে বাস্তবতাবিবর্জিত,পলায়নী মনোবৃত্তি নয় বাস্তব আশাবাদের অভিলাষ ব্যক্ত থাকেঃ
আমৃত্যু শিল্পকলার অহংকার আমি এক মিথ কিংবা না-মানুষ
খুব সোজা চলতে চেয়েছি,একবুক অসুখের বারুদ নিয়েঃ
মণিবন্ধে রেখেছি কিছু ভুল । ভুলগুলো বিষ
বিষগুলো দেহ আক্রান্ত করবার আগেই
কালো কায়তনে কষে বেঁধেছি কোমর,
সে এক বৈশাখী তুফান;
ঝড়ের তাণ্ডবে করতলে কখনোই চাইনি সমাজ বদলানো যাদুর চেরাগ
বেয়াল্লিশ বছর অপেক্ষা করেছি । আর ভুল করবো না
(ভাসমান পরিচয়)
গোধূলির প্রস্থানে জ্বালাও পূর্ণিমার পর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'না মানুষ' প্রকাশের ঊষালগ্নে কবিকে অভিনন্দন ।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন