মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৪
নব্বই দশকের কবিতায় উত্তরাধুনিক চেতনা
।।আয়শা ঝর্ণা ।।
মনঋদ্ধ আবেগ ও ভাবনা কবি আয়শা ঝর্ণা এর কবিতায় স্বকীয় ও স্বাতন্ত্র্য এনে দিয়েছে । তাঁর কবিতায় উদ্ভাসিত নিরবিচ্ছিন্ন ও স্পষ্ট,সুস্থিত বিনির্মাণের ধারা লক্ষ্যণীয়ভাবে অনুভব করা যায় । তাঁর কবিতায় সম-সাময়িক এবং উত্তরাধুনিক সচেতন অনুশীলণের কারণে জীবন দর্শন,প্রতীক,ইতিহাস চেতনা ও ঐতিহ্যবাদ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে ।কাল চেতনার প্রয়োগ, সমষ্টিজীবনের অবিচ্ছিন্ন ধারা এবং শুধু নিজের অস্তিত্বকে অতীতের অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন আবার কখনো কখনো সুদূর ভবিষ্যৎকে নিয়ে গিয়েছেন - প্রকৃতপক্ষে প্রচ্ছন্নের সাথে,নিকটকে দূরের সাথে,বর্তমানকে অতীতের সাথে লীন করে দিতে চেয়েছেন আর সৃষ্টি করেছেন পলিমাটি ভরা এক উজ্জ্বল সংযোগ ভূমি।
উত্তরাদুনিকতা আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আত্মানুসন্ধানের মুখোমুখি।প্রকৃতির পরিপুকতার ধারণা থেকে আত্ম-সম্পূর্ণতার দিকে,স্বয়ম্ভুতার দিকে । আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতার নধ্যে সবচেয়ে বড় প্রভেদ হল একরৈখিকতা ও বহুরৈখিকতা । উত্তরাধুনিকতার মধ্যে মূলে রয়েছে কেন্দ্রকে আঘাত করে বলয় ভেঙে বহুরৈখিকতাকে তেনে আনার সক্রিয়তা । একরৈখিকতার টান যদিও পিছু ছাড়ছে না । কোনো এক কবিতায় কবি একরৈখিক হলেও সমগ্রে দেখা যায় তার বহুরৈখিকতা । এভাবেই একেকজন একেকভাবে তার নিজস্ব আঙ্গিকে জড় হচ্ছেন উত্তরাধুনিকতার বিস্তীর্ণাঞ্চলে :
ময়দানের হাওয়া থেকে জেনেছি তারা আসলে নারীভূক,হিংসাতুর
তাদের মুখের দিকে মুখ করে বলেছি,'আমার চোখের দিকে চোখ
রেখে কতটা অসুখী আমি?'
তোমাদের আনন্দ হয় খুব,উল্লসিত হয়ে ওঠো যখন মৃত্যুকালীন সময়ে
জীবনের দিকে হাত বাড়াই।তোমরা লেখো কত নারকীয় পূরণো এথিক্স।
মুষঢ়ে পড়ি আমিও।সেবার ধর্নশালায় ঠাকুরকে জেগে উঠতে দেখলাম,
অসম্ভব রাগী আর ক্ষয়াটে মুখ।মেট্রোতে চড়ে দেখেছি
তোমাদের বাড়ি ফেরার ক্লান্তি
(ময়দানের হাওয়া)
উত্তরাধুনিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল স্বাধীনতা । আধুনিক কৃষ্ণবিবরে পাঠক ছিল পুরোপুরি লেখকের আজ্ঞাধীন।উত্তরাধুনিক সাহিত্যের ভেতর পাঠক পুরোপুরি স্বাধীন।পাঠকের ভূমিকা এখানে ঊন বা বহিরাগত নয় অন্তর্গতঃ
একটি রক্তাক্ত দুপুর,রোদগুলো রক্তের মত
গড়িয়ে গড়িয়ে দোরগোড়ায়।একটি আধুনিক
অতি আধুনিক যন্ত্র ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
কাঁচের দেয়ালের ওপাশে দু'টো দীর্ঘকায় মানুষ অতি
আদিম যৌনতায় রত।হয়তোবা,হয়তোবা না।
( রক্তাক্ত দুপুর)
গতানুগতিকতার গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে উত্তরাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত করতে, কবিতার অভিনব মাত্রা সংযোগ করতে তিনি বরাবরই বদ্ধ পরিকর।আবেগঘন,বস্তুনিষ্ঠ নৈর্ব্যক্তিকতা - বাস্তবতা মূর্ত করে তোলেন স্বতঃস্ফুর্ততায় ।আনন্দের জন্যেই কবিতা তবুও তিনি কখনো গ্রহণ করেন না উদ্দেশ্য ও নীতিহীন আনন্দ । গভীর বিশ্বাসবোধ থেকে জারিত - উত্তরাধুনিকতা;তাঁর কবিতার মূল বক্তব্যঃ
দুঃখ আর অমানিশা থেকে সেরে ওঠা গেল না আজও।
তোমাদের আত্মীয়তা নিয়ে সন্দেহ নয়।এক জীবনে কতো
আর পিঁপড়ের সারিতে সার বাঁধা যায় কিংবা কোনো বাতাস
তাড়িত শব্দ জলযোগ বিচ্ছিন্নতা ধারণ করা যায়
(অলুক্ষণে পেঁচা)
দৈনন্দিন ও সমকালীন ঘটনাপ্রবাহ কে দেখেন বাস্তবতা বিবর্জিত,রোমান্টিক দৃষ্টিতে নয়,সমাজ সচেতন ও উত্তরাধুনিকবোধাক্রান্ত হয়ে।সামাজিক অনাচারের বিপক্ষে কবি বিষয় ও প্রসঙ্গের সহজ,স্বতঃস্ফুর্ত,স্বাভাবিকতার পাশাপাশি কবিতার ভাষা নির্মাণ ও প্রকৌশলে চিকিৎসক কিংবা বিচারকের দাপ্তরিক ভাষা নয়,নিছক আটপৌঢ়ে ও ব্যকরণ শৃঙ্খলমুক্ত সরল ও সহজবোধ্য ভাষায়,বিভিন্ন আলংকারিক প্রয়োগের মাধ্যমে কবিতাকে স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে যাবার প্রচলিত প্রচেষ্টারতঃ
একুশ বছর একুশ বছর আর যে তিন বছর যুক্ত হয় নি অপরিচিত
নিয়ে বসে থাকে ডানে ঘুরি বায়ে হেলে কয়েক পা পেছনে,চুল ছেড়ার
ইচ্ছেটা।বমি ভাবতা গলা ঠেলে ধীরে ধীরে উঠে আসে,না ঠেঁকিয়ে
রাখি।বেড়ালের পা আর তার শব্দহীনতার কালে আসে ইন্দ্রিয়সমূহ
এ্যালার্ট এ্যাতেনশন,মার্চ অন!পার্শ্ববর্তী কুঠুরী নির্গত করে কিছু
শব্দ কল্ কল্ শর্ শর্ ফিস,ফিস্-হবে একটা,মেতে ওঠে ষড়যন্ত্রে,
ষড়যন্ত্র, ষড়যন্ত্র অস্তিত্বকে ঘিরে ফ্যাকাসে।সচকিত,অনুভূতিপ্রবণ
অনুভূতি বড়ই বিচিত্র
(অস্তিত্ববাদ ও আমি)
।।শাহনাজ মুন্নী।।
এক একজন কবি থাকেন যাদের কবিতায় প্রকাশ্য বিবৃতি এবং বিষয়কে অতিক্রম করে ছন্দ,ভাষা ও শৈলীর প্রয়োগে জীবনঘনিষ্ট চিত্রাবলী পরিস্ফুট হয়ে ওঠে - আমার দৃষ্টিতে শাহনাজ মুন্নী তেমনই একজন । তাঁকে মহিলা কবির দলে ফেলা যাবে না । গতি ও প্রগতির স্রোতধারায় ভবিষ্যৎমুখীন এ কবি তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে আরও বিষাক্ত শর খুঁজে নেন । পূরাতন কবিতার ঐতিহ্য ভেঙে বের হয়ে নূতন এক কাব্য-কলার পরিমার্জনায় যে উচ্ছ্বসিত ভাবাবেগ দেখা যায় তা তাঁর কবিতায় সংহত,ব্যক্ত হৃদয়ের যন্ত্রণা এবং তীক্ষ্ম হৃদয়ানুভূতি - গভীরতর ব্যঞ্জনা পেয়েছে।
রবীন্দ্রযুগের রোমান্টিক ধারার বিরোধিতা করেও তাঁর দৈশিক ও বৈশ্বিক ভাবনা,চিন্তন,মেধা ও মননশীলতা অনুসরণ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধে কিছু তরুণ কবি নূতন ধারার এক কবিতা চর্চ্চা শুরু করেন;যা আধুনিক কবিতা । এ আধুনি কবিতার ফর্ম বা টেক্সট অর্ধ-শতাব্দীকালেরও কিছু বেশী সময় । তারপর বাংলা তথা বিশ্ব কবিতার ইতিহাস এক দীর্ঘ বাঁক নেয় - এর নাম উত্তরাধুনিকতা । এ উত্তরাধুনিক শব্দটি সম্পর্কে অনেকের দ্বিমত,বিভিন্ন তাত্ত্বিকের নানাবিধ বিশ্লেষণ,এর সার্বজনীন ব্যাখ্যা বা গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে নানা তর্ক-বিতর্ক প্রতিনিয়ত চলে আসছে এবং তিন দশককালেরও বেশী সময় ধরে এ তর্কের আজও মীমাংসা হয় নি অর্থাৎ কবিতার অবস্থান - আধুনিক না-কি উত্তরাধুনিক?যুগ-মানসের দোদ্যুলময়তায় সন্দিহান কবি শাহ্ নাজ মুন্নী বলেনঃ
তীর্থযাত্রীদল খোঁজে পবিত্রভূমি;দ্রুত হয় যুগপৎ শ্বাসক্রিয়া
শক্তিগতি;উত্তররুখী ঘরে শীত গায় শীতকাল;চিরকাল ঘিরে ঘিরে বারোটি
কুমারী বোন;মাধ্যাকর্ষণ টেনে রাখে উড়ন্ত মানুষ।
আমি সেই সতর্ক সিংহ শিকারীকে জানি;অকৃত্রিম আঁধার তার চিবুকে
ফিনকি দ্যা রক্ত।কুয়াশায় সিংহের কেশর ভাসে,রোয়া ঝরে এবং চামড়া
ছাড়াবার পর মৃত সিংহ হয় আরেকটি নীল কাক
( বিস্তারিত ভাঙচুর )
উত্তরাধুনিক মানুষের হতাশা,জীবন জটিলতা,অস্তিত্বের সংকট,সমাজের সঙ্গে অনন্বয় এবং স্বীয় সত্ত্বার বিচ্ছিন্নতার চিত্রকল্প তাঁর কবিতায় বিষাদ ভারাক্রান্ত করে বিচ্ছিন্নতার বিস্তৃতি ঘটেছে ব্যাপকভাবে;অন্তর্নিহিত বোইপরীত্য ও এটিএম যাতনা থেকে উদ্ভূত জীবনের অর্থহীনতা ,সভ্যতার কপটাচার,তাঁর বিচ্ছিন্নতার জ্বালা মেটতে পারে নিঃ
ঘন অরণ্যকে চিনিয়ে দিয়েছি উদাস হওয়ার পথ
এবার শুধু সময়-সুযোগ মতো তল্পি-তল্পা বেঁধে বেরিয়ে পড়া
এই নিশ্চিতি ছেড়ে একেকবার খুব ঝুঁকি নিতে ইচ্ছা করে তার
ইচ্ছা করে মাটির সংসার ভুলে শেকড়-বাকড় উপড়ে কিছুকাল ঘুরে আসে দূরে
ডাইনিরা হেসে বলে,ঘন অরণ্য হেঁটে এলে দুর্ভাগ্য পিছু ধরে
( দীর্ঘ শুষ্কতায় )
আমরা বাস করছি উত্তরাধুনিক বিশ্বে । সময়ের সাথে সাথে পালটে গেছে চিরাচরিত লোকায়ত প্রথা,বিশ্বাস ও বিশ্বও ।আমাদের চিন্তা,চেতন ও মননকে নাড়া দিয়ে যায় মিশেল ফুকো,জ্যাক দেরিদা,রোলা বার্ত,লেভি স্ট্রস প্রমুখ চিন্তাবিদদের ভাবনা ও তত্ত্ব।উত্তরাধুনিকতার মূলমন্ত্র হল সৃজন নয়,বিনির্মাণ । উত্তরাধুনিক পূর্বকালে পাঠক ছিল লেখকের আজ্ঞাধীন কিন্তু এখন লেখক নয়,পাঠ ও বিষয় পাঠকের হাতে ।আর এই মনোজগতের নূতন ভাষা ,'পাঠকৃতি';যা গড়ে উঠেছে বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক ফার্দিনান্দ দ্য সোস্যুরের ভাষাতত্ত্বকে ধারণ করে । একবিংশ শতাব্দীর মানুষ কেবল অর্থনীতি বা যৌণের দ্বারা শাষিত নয় বরঞ্চ নিয়ন্ত্রিত ভাষার দ্বারাঃ
সৃষতিতে ঈশ্বরও নিখুঁত নন মাঝে মাঝে
এরকম আশ্বাসে ভয় কাটে
নিজের কাজ দেখে চাপড়াই পিঠ
বাহ্ বাহ্ বেশ।
এই করে এক পথে হাঁটায় ক্ষুধা
আর পথে পেম
পথে পথে ঋণী করে সুজন মানুষ
ঋণেতে সুফল কম ছোটো থেকে জানি
(নিখুঁত সংক্রান্ত)
নীৎসে ঘোষণা করেছিলেন ঈশ্বর মৃত্যুবরণ করেছেন অর্থাৎ রঙ্গমঞ্চে নায়কের আর প্রয়োজন নেই।দর্শকদের মধ্য থেকেই উঠে দাড়াঁতে হবে নায়ককে অর্থাৎ ঈশ্বরের স্থান পূর্ণ করবে মানুষ,অতি মানুষ।য়্যুরোপে রেনেসাঁর কাল হল মানব জাগরণের, মানবমুক্তির। মানুষ যে শুধু ঈশ্বরকে অস্বীকার করা শুরু করল শুধু তাই নয় তাকে অপ্রয়োজনীয়,বাতিল বস্ততে পরিণত করে মানুষ নিজেকেই ঈশ্বরের স্তরে উপনীত করে ফেলল:
কম্পিউটারের যান্ত্রিক কন্ঠস্বরটি ভালোবেসে
প্রতিবার ভুল নাম্বারে ডায়াল করেছে যে হতভাগী-
পানির নিচে ময়নার মতো উত্তেজনা থিতিয়ে এলে
তার মনে পড়েছে
আমি তো গাছের মেয়ে,গাছ মানবী
গাছের ভাগ্য মেনে এই মাঠে একা দাঁড়িয়েছি
মরা কার্তিকে ঝরেছে যেসব নীলপাতা
সেসবের জন্যে শোক করে লাভ নেই
(গাছ মানবী)
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন