Powered By Blogger

সোমবার, ১৮ জুন, ২০১২

নান্দনিক কবি সুমী সিকানদার

কবি সুমী সিকানদার সত্ত্বার গভীরতর অর্থ অনুসন্ধানে ব্যাপৃত থেকে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'নদীটা রেখে যাও' এ মানবিক অস্ত্বিতে এনেছেন অভিনবত্ব ও আত্মপ্রত্যয়জাত স্বাদ।তাঁর এ প্রত্যয়ের উৎস মানবিক প্রেম,স্বদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত সময়,দৈনন্দিন জীবঙ্গাঁথার মধ্যে নিজেকে খোঁজার এবং অনুভূতির সুতীক্ষ্ম বিস্তৃতির ফলেই তাঁর কবিতায় সত্যিকার গভীরতা স্পর্শ করেছেঃ

নদীটা রেখে যাও
মাঝরাত্তিরে ফেরত দেবো।
দেবো ঠোঁট ভেজা ভোর,
বিকেলের নিংড়ানো নয়ন....রাতের রোপণ...সব।
ফিরে যাবে...।
টুকরো টুকরো জোছনায় ঢলে পড়া রুপালী রং প্রেম।
বিবর্ণ বকুলের বাসি প্রাণ......অস্তাভা।
অপেক্ষার আকাশের উড়ন্ত গাংচিলের ছায়া পড়বে
বিষন্ন নদীর গালে।

নদীটা রেখে যাও...
রাত বাড়ছে দেখো!!
হু হু করে বাড়ছে অলভ্য লোভ...ক্ষিপ্ত ক্ষোভ
এখনই ফেরৎ পাবে...
দম্য দরিয়ার ঠিক মাঝ ঘূর্ণনে...
অদম্য দয়িতা তোমার।
( নদীটা রেখে যাও......মাঝরাতিরে ফেরত দেব)

নিরন্তর প্রস্তুতির মাঝে নিজেকে ধরে রেখেছেন কবি সুমী সিকানদার।সমকালকে তিনি মেপে চলেছেন মহাকালের বাটখারায় তাই তাঁর কবিতায় দেখি সৃষ্টিশীলতার বহুবর্ণা  ঔজ্জ্বল্য ঠিকরে বেড়িয়ে আসে কবিতার লাইন ফুঁড়ে।আত্ম-চেতনা ও সৃষ্টির বিপুল আনন্দে আত্মহারা এ কবি পূর্বসুরীদের গতানুগতিক ভাবধারা সযত্নে এড়িয়ে চলার লক্ষ্যনীয় প্রয়াসে লিপ্ত।প্রথাগত আনন্দের ঝলকানি,বেদনার বিষাদাত্মক যন্ত্রণা কিংবা বাস্তবতার নিরেট পাথরও তাঁর কাছে গুরুত্ব বহন করে না।সৃজনশীলতার চরম উৎকর্ষে থেকে তিনি বিনির্মাণ করেন কবিতা;পৃথক ও স্বাতন্ত্র্যবোধের অভিনব ভাব,ভাষা ও বক্তব্যে উপস্থাপিত দ্বন্দ্বে ভরা এক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় পাঠক হৃদয়ঃ

আঁধারে টুপটাপ টপকায় তস্কর
কুয়াশার আঁকিবুকি কেটে কেটে
ঢুকে পড়ে বর্বর গহ্বরে।
তাড়ি খাওয়া রাত ঢুলতে থাকে
বাড়তে থাকে ত্রিতাল প্রদাহ
খাঁজকাটা নকশায়
এলোমেলো গলা সাধে
উদারা মুদারা তারা তিনবোন।
(নিদ্রাভঙ্গ)

কবি  সুমী সিকানদার নিজের ভেতর থেকেই গড়ে তোলেন বিরল ও সুক্ষ্ম মননের তন্তুজাল আর তা তিনি কখনো ঊর্ণনাভ,কখনো বা গুটিপোকা;যার নিঃশব্দ,একক প্রচেষ্টায় নিজেরই চারধারে বুনে নেন ভাব ও ভাবনার রেশমী জগৎ।আলো ও অন্ধকারের জ্বলজ্বলে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের গভীরতর সত্ত্বার বোধে লুকিয়ে থাকা স্কাইলার্ক পাখি এক,কখনো নাইটিঙ্গেল;অন্ধকারের মধ্য থেকেও গান দিয়ে নিঃসঙ্গতার লাঘব ঘটাতে সচেষ্ট শৈল্পিক অভিজ্ঞতার প্রগাঢ়তা ও তীব্র সংবেদনশীল,আত্মোপলব্ধিজাত ঈন্দ্রায়ানুভূতিঃ

১৪.
একবার সাহস করে
শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হয়েই দেখো না,
দেখবে উড়ে উড়ে ভালোবাসতে
কী দারুণ যন্ত্রণা লাগে।
(মনকাব্য)

সুমী সিকানদার আত্ম-জৈবনিক,রোমান্টিক একজন কবি।আজন্ম শিল্প-তৃষিত কবি সুমী সিকানদার শিল্প-চেতনাকেই নান্দনিকতার মূল উৎস বলে মনে করেন।মানবজীবনের মহত্ত্বম উপলব্ধি হছে প্রেম আর তাই তাঁর কবিতায় প্রেমের স্থান অবশ্যম্ভাবী।স্বতন্ত্র, নান্দনিক শৈলী,চেতনা  ও নন্দনতাত্ত্বিক দার্শনিকবোধের কারণেই তাঁর কবিতা সৌন্দর্য্য চেতনাকে স্পর্শ করে কাব্যিক চেতনায়,সত্ত্বার গভীরতর আবেগের কল্পনায় সীমার মধ্যে অসীমের স্পর্শ সঞ্চরনশীল;যা প্রেম চেতনার সঙ্গে নন্দনতত্ত্বের নিবিড় সংযোগে প্রেমকে চিত্রিত করেছেন সর্ব প্রসারীরুপে প্রতীকের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন অতি-প্রাকৃত আরেক প্রতীকঃ

আমি হাঁটছি......
ম্লান নির্জনতার পায়ে পায়ে,
আমার বড্ড ভালো লাগছে।
বেণীতে করে তোমাকে এনেছি চুপচাপ।
সূর্য আর সর্ষে,জোড়া হলুদ ডুবলেই
বেণী খুলে ভাববো তোমায়।।
(নির্জনতার খোঁজ)

সুমী সিকানদার স্বতস্ফুর্ত সৃজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলো ফেলে দৈনন্দিন জীবন-যাত্রা তথা মানব্জীবন ও নিবিড় প্রকৃতির এক আবেগ ও আনন্দঘন মুহূর্তের প্রতিভাস মূর্ত করে তোলেন স্বীয় মেধা ও অভিজ্ঞানে বিশ্ব প্রকৃতির অনন্ত সৌন্দর্য্য ও আনন্দে বিনির্মাণ করেন প্রকৃতি ও মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের এক ও অদ্বিতীয় বিষয়ে কবিতাঃ

প্রতিদিন ফোঁটা ফোঁটা দুঃখগুলি
মনের কার্নিশ বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে,
কবিতার গাক ছুঁয়ে ছূঁয়ে,আমি এতদিন দেখিনি,
সুখগুলো কেবলি তাড়াহুড়ায়
মেঘদলের দেখানো পথে উড়ে গেল অবলীলায়...
আমি ধরতেও পারিনি।
একগুঁয়ে মেঘ......প্রতিশোধের নেশায়......
আমার ভেজা মন আরো ভেজায়।
বিরহের বিবর্ণ শ্যাওলা জমে জমে
নেশাতুর ভালোবাসা হয়।
এখন বুঝতে পারছি...ভালোবাসার নেশায়
রাত হয়েছে সুন্দরী ।
(রাত হয়েছে সুন্দরী)

সুমী সিকানদারের কবিতার নন্দনতত্ত্বে পরাবাস্তব্বাদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।এই পরাবাস্তববাদী নন্সনচেতনা গভীরভাবে অনুধাওবণের ফলে কবিতায় যৌক্তিওকতা,অপার্থিব সৌন্দর্য্যে বিহ্বলতার কারণে চৈতন্যের সংকটে জর্জরিত কবি সুমী সিকানদার কল্পণার জগতে বিচরণ করে,আত্মোন্মোচনের মধ্য দিয়ে বাস্তবতার প্রকৃত স্বরুপকে উন্মোচন করেন অভিনব শৈল্পিক ভঙ্গিমায়ঃ

জমজমাট দুঃখগুলো
নীলরাতে অলস জ্যোৎস্না পোহায়।
ঘুটঘুটে অন্ধকার টান মেরে জড়িয়ে ধরে,
পিষে ফেলে নির্মম বর্বরতার।
(অলস জ্যোৎস্না)

লৌকিক এবং দিব্য----উভয় সৌন্দর্য্যবোধই  মন-মানসে ধারণ করেন কবি সুমী সিকানদার।সুন্দরের মধ্যে তিনি দেখেন গুণ,পরিমাণ,সম্বন্ধ ও আকৃতি।সুন্দর তাই তার কাছে ধারণামূলক হলেও আনন্দদায়ক,রুচি ও রসবোধে  জারিত রুপের সৌন্দর্যই শিল্পের সৌন্দর্য্যঃ

গাছেদের চিল চিৎকারে যখন জ্বলে উঠেছে দানানল!
তখনই নীল আকাশের রঙ বদলেয় নামল---
অঝোর শ্রাবণ।

ওমনি ফুরিয়ে গেল তোমারত চাওয়া....
ফিরে গেল উদাসী হাওয়া....
কুঁকড়ে গেল লজ্জাবতীর ঝাড়,অপেক্ষার অপমানে
থেমে গেল পাতাদের মর্মর চাহনী....
আমার জন্য জমিয়ে রাখা নিষিদ্ধ ঘ্রাণ....
ও বর্বর ভালোবাসা।
তুমি মুখ ফিরিয়ে রইলে
সর্ষে রঙ হলুদ বসন্তে
আমার জন্য রইল কেবল জলভরা শ্রাবণ...শ্রাবণ।।
(দাবানল)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন