'আধুনিক কবিতা এক আন্তর্জাতিক'প্রপঞ্চ;যা আধুনিক বা আধুনিকতাবাদ নামে অভিহিত। এর জন্ম পাশ্চাত্যে এবং কালের প্রভাবে তা ক্রমে গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।আধুনিক শব্দটি এসেছে অধুনা শব্দ থেকে;যার আভিধানিক অর্থ সম্প্রতি বা আজকাল।সে সূত্রে আধুনিক শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় সাম্প্রতিক বা আজকালকার।সুতরাং আধুনিক কথাটির কালগত তাৎপর্য্য রয়েছে।রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,'পাঁজি মিলিয়ে মডার্নের সীমানা নির্ণয় করবে কে?এটা কালের কথা ততটা নয় যতটা ভাবের কথা।'-('আধুনিক কাব্য',সাহিত্যের পথেঃরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। অর্থাৎ সময়কে তিনি গৌণের কোঠায় ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু জীবেন্দ্র সিংহ রায় রবীন্দ্রনাথের এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেছেন,'আধুনিক শব্দের ব্যুৎপত্তির দিকে লক্ষ্য রাখলে তাঁর বক্তব্য মেনে নেওয়া যায় না।কেননা আধুনিকতা কখনও সাম্প্রতিকতাকে বাদ দিয়ে আসতে পারে না। কালের বর্তমান পদচিহ্ন অনুসরণ করেই তার যাওয়া আসা।'-('আধুনিকতা,আধুনিক কবিতার মানচিত্রঃজীবেন্দ্র সিংহ রায়)।আধুনিকতা একটি আপেক্ষিক ধারণা।আধুনিকতা শব্দটি বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়,কোন পাঠকগোষ্ঠীর সাধারণ রুচি ও শিল্পের মান ও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ততার।
রবীন্দ্রনাথ,মাইকেল মধুসূদন দত্ত কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁদের সময়ে নিশ্চয়ই অনাধুনিক ছিলেন না।শিল্পকর্ম তা কোন চিত্রকর্ম বা কবিতাই তা বিশেষকালের ক্ষেত্রে আধুনিক হতে পারে,সর্বকালেই নয়। রবীন্দ্রনাথ যেমন ১৩০০ সনে কল্পণা করেছিলেন,'আজি হতে শতবর্ষ পরে/কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/কৌতুহল ভরে,/আজি হতে শতবর্ষ পরে!'রবীন্দ্রনাথের কবিতা আজও আমদের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়,তা কি আধুনিক বলে? না-কি কালজয়ী বলে?কালিদাস,শেকসপিয়ার,টলষ্টয় এমন কত ঔপন্যাসিক,নাট্যকার-কবি আছেন যাঁদের সৃষ্টি প্রত্যেক যুগের পাঠককে নিত্য-নূতনভাবে টানে।সে তো তাঁদের সৃষ্টি শাশ্বতভাবে আধুনিকবলে নয়-কালজয়ী বলে। শাশ্বতভাবে 'আধুনিক' ও 'কালজয়ী' সমার্থবাচক নয়।তাই আধুনিকতা প্রসঙ্গে 'শাশ্বতভাবে আধুনিক' কথাটির তাৎপর্য্য নেই।-('আধুনিকতা,আধুনিক কবিতার মানচিত্রঃজীবেন্দ্র সিংহ রায়)
প্রত্যেক দশক বা কালে এক বা একাধিক গুণী কবি,চিন্তাবিদ,দার্শনিক,শিল্পী জন্মে থাকেন।এঁরা তাঁদের সময়ের থেকে অগ্রগামী এবং স্ব স্ব সমাজে সম-সাময়িক রুচি ও শিল্পের মান পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন।এ সকল মনীষী সমাজ ও রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যাবতীয় সনাতন রীতি-নীতি,কূপমন্ডুকতা,অনগ্রসরতা ও পশ্চাৎমুখীনঅতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে কালে কালে,দশকে দশকে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে টেনে নিয়ে গেছেন।এঁরা সমকালকে সাথে নিয়ে মহাকালের প্রান্তর চষে বেড়ান কিংবা মহাকালের নিক্তিতে সমকালকে পরিমাপ করেন।।এঁদের হাতে পূর্বকালের মণীষীদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শন পরিমার্জিত,সংশোধিত কিংবা কখনো কখনো পরিত্যাজ্যা হয়ে আসছে।যিনি যতবেশী শক্তিমান,তিনি ততবেশী পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকেন।পৃথিবী সৃষ্টির যুগ থেকেই সবার অলক্ষ্যে কিংবা কখনো কখনো বিস্ময়কর,বিপর্য্যস্তভাবে এটা ঘটে চলেছে।
১৮৮০ সনে বোদলেয়ার,ম্যালার্মের আবির্ভাব কালকে আধুনিকতার সুচনাকাল ধরা হয়।এ সময় কতকগুলো বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিস কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মতবাদের কারণে মানুষ ঈশ্বরবিমুখ হয়ে পড়েন,সমালোচনা শুরু করেন চার্চের একচ্ছাত্রাধিপত্যবাদ ও বুর্জোয়া সমাজের। এ সময় বিদগ্ধজনেরা সমাজের নৈরাশ্যচেতনা ও অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।তাঁরা একেবারে গোড়া থেকেই ছিলেন বিদ্রোহী।সমাজ ও দেশের পূরানো মতবাদ,ঈশ্বরবিশ্বাস ও চার্চের একচ্ছাত্রাধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁদের চিন্তা,চেতনা ও লেখায় ঈর্ষণীয় সাফল্য ফুটে ওঠে,ফুটে ওঠে নান্দনিক শিল্পকলায়।১৯১০ থেকে ১৯২৫ সনকে ধরা হয় আধুনিকতাবাদের শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় পাশ্চাত্য দগ্ধীভুত হয় অপব্যয়ী প্রথম মহাযুদ্ধে, মানুষ মেতে ওঠে রক্তপাতে,যুদ্ধের পর হতাশা ও অবিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় বিশ শতকের শিল্পকলা,কবিতা ;যার মধ্যে থাকে আধুনিকতাবাদ। এককথায় বিংশ শতাব্দীর মানুষের শ্রেষ্ঠ অর্জন কবিতায় আধুনিকতাবাদ।বলা যেতে পারে পাশ্চাত্যে প্রত্যেক শতকেই শিল্পকলার জগতে পরিবর্তন ঘটে গেছে নীরবে,অলক্ষ্যে,পরিবর্তন হয়েছে মন,মনন ও সংবেদনশীলতার কিন্তু তা কোনো সমাজ ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত নাড়িয়ে দেয় নি। কিন্তু আধুনিক কবিতা সমস্ত ভীরুতা ও নৈরাশ্যবাদকে জড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলে বিপর্য্যয়রুপে আত্ম-প্রকাশ করেছে।১৯১৮ সনে হপকিন্সের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'The Poems of Gerard Manley Hopkins' প্রকাশের পর ইংরেজ কবিতার পাঠকেরা আধুনিক কবিতার বিচিত্র স্বাদ পেলেন।পূর্বেই বলেছি,প্রথম মহাযুদ্ধের পরে জন্ম নেয় নূতন এক শিল্পকলার;যার ফলে সনাতন ও রক্ষণশীল সমাজের ভাবধারায় আমূল পরিবর্তন ঘটার ফলে ইংরেজি সাহিত্যেও এর প্রভাব পড়ে।আমেরিকান সাহিত্যও পিছিয়ে থাকে না। এ সময় ১৯১৫ সনে 'Some Imagist Poets' শীর্ষক সংকলনে Imagist দলভূক্ত কবিদের কবিতা প্রকাশিত হয় ফলে বৃটেন ও আমেরিকায় কবিতা এক নূতন মাত্রা পায়।এই নূতন মাত্রার সাথে যুক্ত হয় যখন টি,এস,এলিয়টের প্রধান প্রভাবসম্পাতী কাব্যগ্রন্থ'The Waste Land' বা পোড়ামাটি প্রকাশিত হয়;যেখানে তিনি প্রচলিত কবিতার রীতি ভেঙ্গে নিয়ে আসেন অভিনবত্ব।তারপর থেকে এটি বিবেচিত হয়ে এসেছে আধুনিক নগরজীবনের ভাষ্য হিসেবে। ঐ কবিতায় পোড়োমাটির যে উদ্ভাস তাঁর হৃদয়ে মরুময় কণ্টকময় হয়ে উঠেছিল তা শুধু ইংরেজি কবিতাই নয়, তা ছিল বিশ্বের নানা দেশের কবিতা ও ভূগোল। ঠিক একই সময়ে বাংলা কবিতায়ও সনাতন রীতি-নীতি ও পশ্চাদ্মুখীনতা আকড়ে না থেকে সমকালের দাবী মেনে নিয়ে বিবর্তিত হতে থাকে। ''তিরিশের দশকের বাঙালি কবিরা এলিয়টের প্রত্যক্ষ প্রভাবে কবিতা রচনা শুরু করেন। এলিয়টের অনুকরণে কলকাতা নগরীকে তাঁরা ভাবতে শুরু করেন ভিড়াক্রান্ত লন্ডন নগরীর অশুভ পাপময়তা-পচনশীলতার এতদ্দেশীয় প্রতিরূপ হিসেবে। (এলিয়টের লন্ডন নিজেই ছিল আধুনিকবাদের আদিগুরু বোদলেয়ারের প্যারিসের প্রতিরূপ।) তারপর থেকে দীর্ঘ দিন বাঙালি কবির কাছে আকাশ মানেই ছিল বিধ্বস্ত নীলিমা, বাতাস মানেই অসুস্থ বিকারগ্রস্ত পঙ্গু মানুষের ঘামের গন্ধে বিষাক্ত, বিষন্ন। জীবনানন্দের রাত্রি কবিতায় দেখি “হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল/... থামে ঠেস দিয়ে লোল নিগ্রো হাসে/নগরীর মহৎ রাত্রিকে তার মনে হয় লিবিয়ার জঙ্গলের মতো।”-- এরকম বর্ণনা এলিয়টভাবিত ও প্রভাবিত।...''(খোন্দকার আশরাফ হোসেন : ইঙ্গ-মার্কিন কবিতায় আধুনিকবাদ)।আধুনিক বাংলা কবিতার পথিকৃৎ মূলতঃ জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু,সুধীন্দ্রনাথ দত্ত,অমিয় চক্রবর্তী ও বিষ্ণু দে;যারা পঞ্চপান্ডব নামে খ্যাত।এঁদের হাতেই ইউরোপীয় আধুনিকতার আদলে আধুনিক বাংলা কবিতার গোড়াপত্তন হয়।বাংলায় আধুনিকতার গোড়াপত্তন হয় ১৯২৫ সনে;যা ইউরোপীয় আধুনিক কবিতার সমবয়সী।
(ক্রমশঃ)
http://www.bangladeshnews24x7.com/literatare/81-ghotonaprobaho/135-2010-11-30-14-45-48.html?tmpl=component&print=1&layout=default&page
রবীন্দ্রনাথ,মাইকেল মধুসূদন দত্ত কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁদের সময়ে নিশ্চয়ই অনাধুনিক ছিলেন না।শিল্পকর্ম তা কোন চিত্রকর্ম বা কবিতাই তা বিশেষকালের ক্ষেত্রে আধুনিক হতে পারে,সর্বকালেই নয়। রবীন্দ্রনাথ যেমন ১৩০০ সনে কল্পণা করেছিলেন,'আজি হতে শতবর্ষ পরে/কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/কৌতুহল ভরে,/আজি হতে শতবর্ষ পরে!'রবীন্দ্রনাথের কবিতা আজও আমদের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়,তা কি আধুনিক বলে? না-কি কালজয়ী বলে?কালিদাস,শেকসপিয়ার,টলষ্টয় এমন কত ঔপন্যাসিক,নাট্যকার-কবি আছেন যাঁদের সৃষ্টি প্রত্যেক যুগের পাঠককে নিত্য-নূতনভাবে টানে।সে তো তাঁদের সৃষ্টি শাশ্বতভাবে আধুনিকবলে নয়-কালজয়ী বলে। শাশ্বতভাবে 'আধুনিক' ও 'কালজয়ী' সমার্থবাচক নয়।তাই আধুনিকতা প্রসঙ্গে 'শাশ্বতভাবে আধুনিক' কথাটির তাৎপর্য্য নেই।-('আধুনিকতা,আধুনিক কবিতার মানচিত্রঃজীবেন্দ্র সিংহ রায়)
প্রত্যেক দশক বা কালে এক বা একাধিক গুণী কবি,চিন্তাবিদ,দার্শনিক,শিল্পী জন্মে থাকেন।এঁরা তাঁদের সময়ের থেকে অগ্রগামী এবং স্ব স্ব সমাজে সম-সাময়িক রুচি ও শিল্পের মান পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন।এ সকল মনীষী সমাজ ও রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যাবতীয় সনাতন রীতি-নীতি,কূপমন্ডুকতা,অনগ্রসরতা ও পশ্চাৎমুখীনঅতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে কালে কালে,দশকে দশকে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে টেনে নিয়ে গেছেন।এঁরা সমকালকে সাথে নিয়ে মহাকালের প্রান্তর চষে বেড়ান কিংবা মহাকালের নিক্তিতে সমকালকে পরিমাপ করেন।।এঁদের হাতে পূর্বকালের মণীষীদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শন পরিমার্জিত,সংশোধিত কিংবা কখনো কখনো পরিত্যাজ্যা হয়ে আসছে।যিনি যতবেশী শক্তিমান,তিনি ততবেশী পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকেন।পৃথিবী সৃষ্টির যুগ থেকেই সবার অলক্ষ্যে কিংবা কখনো কখনো বিস্ময়কর,বিপর্য্যস্তভাবে এটা ঘটে চলেছে।
১৮৮০ সনে বোদলেয়ার,ম্যালার্মের আবির্ভাব কালকে আধুনিকতার সুচনাকাল ধরা হয়।এ সময় কতকগুলো বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিস কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মতবাদের কারণে মানুষ ঈশ্বরবিমুখ হয়ে পড়েন,সমালোচনা শুরু করেন চার্চের একচ্ছাত্রাধিপত্যবাদ ও বুর্জোয়া সমাজের। এ সময় বিদগ্ধজনেরা সমাজের নৈরাশ্যচেতনা ও অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।তাঁরা একেবারে গোড়া থেকেই ছিলেন বিদ্রোহী।সমাজ ও দেশের পূরানো মতবাদ,ঈশ্বরবিশ্বাস ও চার্চের একচ্ছাত্রাধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁদের চিন্তা,চেতনা ও লেখায় ঈর্ষণীয় সাফল্য ফুটে ওঠে,ফুটে ওঠে নান্দনিক শিল্পকলায়।১৯১০ থেকে ১৯২৫ সনকে ধরা হয় আধুনিকতাবাদের শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় পাশ্চাত্য দগ্ধীভুত হয় অপব্যয়ী প্রথম মহাযুদ্ধে, মানুষ মেতে ওঠে রক্তপাতে,যুদ্ধের পর হতাশা ও অবিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় বিশ শতকের শিল্পকলা,কবিতা ;যার মধ্যে থাকে আধুনিকতাবাদ। এককথায় বিংশ শতাব্দীর মানুষের শ্রেষ্ঠ অর্জন কবিতায় আধুনিকতাবাদ।বলা যেতে পারে পাশ্চাত্যে প্রত্যেক শতকেই শিল্পকলার জগতে পরিবর্তন ঘটে গেছে নীরবে,অলক্ষ্যে,পরিবর্তন হয়েছে মন,মনন ও সংবেদনশীলতার কিন্তু তা কোনো সমাজ ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত নাড়িয়ে দেয় নি। কিন্তু আধুনিক কবিতা সমস্ত ভীরুতা ও নৈরাশ্যবাদকে জড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলে বিপর্য্যয়রুপে আত্ম-প্রকাশ করেছে।১৯১৮ সনে হপকিন্সের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'The Poems of Gerard Manley Hopkins' প্রকাশের পর ইংরেজ কবিতার পাঠকেরা আধুনিক কবিতার বিচিত্র স্বাদ পেলেন।পূর্বেই বলেছি,প্রথম মহাযুদ্ধের পরে জন্ম নেয় নূতন এক শিল্পকলার;যার ফলে সনাতন ও রক্ষণশীল সমাজের ভাবধারায় আমূল পরিবর্তন ঘটার ফলে ইংরেজি সাহিত্যেও এর প্রভাব পড়ে।আমেরিকান সাহিত্যও পিছিয়ে থাকে না। এ সময় ১৯১৫ সনে 'Some Imagist Poets' শীর্ষক সংকলনে Imagist দলভূক্ত কবিদের কবিতা প্রকাশিত হয় ফলে বৃটেন ও আমেরিকায় কবিতা এক নূতন মাত্রা পায়।এই নূতন মাত্রার সাথে যুক্ত হয় যখন টি,এস,এলিয়টের প্রধান প্রভাবসম্পাতী কাব্যগ্রন্থ'The Waste Land' বা পোড়ামাটি প্রকাশিত হয়;যেখানে তিনি প্রচলিত কবিতার রীতি ভেঙ্গে নিয়ে আসেন অভিনবত্ব।তারপর থেকে এটি বিবেচিত হয়ে এসেছে আধুনিক নগরজীবনের ভাষ্য হিসেবে। ঐ কবিতায় পোড়োমাটির যে উদ্ভাস তাঁর হৃদয়ে মরুময় কণ্টকময় হয়ে উঠেছিল তা শুধু ইংরেজি কবিতাই নয়, তা ছিল বিশ্বের নানা দেশের কবিতা ও ভূগোল। ঠিক একই সময়ে বাংলা কবিতায়ও সনাতন রীতি-নীতি ও পশ্চাদ্মুখীনতা আকড়ে না থেকে সমকালের দাবী মেনে নিয়ে বিবর্তিত হতে থাকে। ''তিরিশের দশকের বাঙালি কবিরা এলিয়টের প্রত্যক্ষ প্রভাবে কবিতা রচনা শুরু করেন। এলিয়টের অনুকরণে কলকাতা নগরীকে তাঁরা ভাবতে শুরু করেন ভিড়াক্রান্ত লন্ডন নগরীর অশুভ পাপময়তা-পচনশীলতার এতদ্দেশীয় প্রতিরূপ হিসেবে। (এলিয়টের লন্ডন নিজেই ছিল আধুনিকবাদের আদিগুরু বোদলেয়ারের প্যারিসের প্রতিরূপ।) তারপর থেকে দীর্ঘ দিন বাঙালি কবির কাছে আকাশ মানেই ছিল বিধ্বস্ত নীলিমা, বাতাস মানেই অসুস্থ বিকারগ্রস্ত পঙ্গু মানুষের ঘামের গন্ধে বিষাক্ত, বিষন্ন। জীবনানন্দের রাত্রি কবিতায় দেখি “হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল/... থামে ঠেস দিয়ে লোল নিগ্রো হাসে/নগরীর মহৎ রাত্রিকে তার মনে হয় লিবিয়ার জঙ্গলের মতো।”-- এরকম বর্ণনা এলিয়টভাবিত ও প্রভাবিত।...''(খোন্দকার আশরাফ হোসেন : ইঙ্গ-মার্কিন কবিতায় আধুনিকবাদ)।আধুনিক বাংলা কবিতার পথিকৃৎ মূলতঃ জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু,সুধীন্দ্রনাথ দত্ত,অমিয় চক্রবর্তী ও বিষ্ণু দে;যারা পঞ্চপান্ডব নামে খ্যাত।এঁদের হাতেই ইউরোপীয় আধুনিকতার আদলে আধুনিক বাংলা কবিতার গোড়াপত্তন হয়।বাংলায় আধুনিকতার গোড়াপত্তন হয় ১৯২৫ সনে;যা ইউরোপীয় আধুনিক কবিতার সমবয়সী।
(ক্রমশঃ)
http://www.bangladeshnews24x7.com/literatare/81-ghotonaprobaho/135-2010-11-30-14-45-48.html?tmpl=component&print=1&layout=default&page

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন