পটভূমিঃচট্টগ্রাম বিশ্ব-বিদ্যালয় সংলগ্ন অখ্যাত 'জোবরা' গ্রাম সারা বিশ্বে খ্যাতি পেয়েছে ক্ষুদ্রঋণের জন্মভূমি হিসেবে আর সুফিয়া খাতুন এ গ্রামেরই এক দরিদ্র অধিবাসী;তিনিও ক্ষুদ্রঋণের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন----প্রথম ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা কিংবা ক্ষুদ্রঋণের প্রথম বলির পাঠাঁ হিসেবে।১৯৭৬ সালে গবেষণা কার্যক্রম হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জোবরা গ্রামে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম শুরু করেন মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। ১৯৮৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে গ্রামীণ ব্যাংক।ডঃ ইউনুসের ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য হিসেবে সারাবিশ্বে তুলে ধরা হয় জোবরা গ্রামের সুফিয়া খাতুনকে।বিভিন্ন দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয় যে,গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণে সুফিয়া খাতুন স্বাবলম্বী হয়েছেন,তিনি পাকা বাড়ী করেছেন।কিন্তু প্রকৃত তথ্য যে,সুফিয়া খাতুন স্বাবলম্বী নয় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যান ১৯৯৮ সালে।গ্রামবাসী চাঁদা তুলে তার লাশ দাফনে্র ব্যবস্হা করে।
দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে জোবরা গ্রামের সিকদার পাড়ার অভাবী নারী সুফিয়া খাতুনের হাতে প্রথমে ২০(কুড়ি) টাকা ঋণ তুলে দেন তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ মুহম্মদ ইউনুস এবং পরবর্তীতে বেশী ঋণের আশ্বাস পেয়ে নির্ধারীত সময়ের আগেই ঋণ পরিশোধ করে দেন সুফিয়া বেগম এবং নূতন করে ঋণ পান ৫০০(পাঁচশত) টাকা।একসঙ্গে এত টাকা পাওয়ার আনন্দে সুফিয়া খাতুন তা সারা গ্রামে জানিয়ে দেন এবং এর অল্পদিনের মধ্যেই পূরো গ্রাম চলে আসে ডঃ ইউনুস মুহম্মদের খপ্পড়ে অর্থাৎ ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের আওতায়।জোবরার ঘরে ঘরে তখন নগদ টাকার উৎসব।কিন্তু এ উৎসব ফিকে হতে বেশীদিন লাগেনি।সুদে-আসলে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে সর্বশান্ত হয়েছেন অনেকে,এলাকা ছেড়েছেন রহিমা ও সায়েরা খাতুনসহ কেউ কেউ।
সুফিয়া খাতুনের দুই মেয়ে হালিমা ও নূরনাহারের দিন কাটে এখন অনাহারে-অর্ধাহারে।গ্রামীণ ব্যাংকের প্রথম ঋণ গ্রহীতা সুফিয়া খাতুনের বাড়ীতে পাঁচ কাঠা জমির ওপর হালিমা ও নূরনাহারের পৃথক দু'টো ভিটে।তাদের চাষাবাদযোগ্য আর কোনো জমি নেই।সুফিয়া খাতুনের মেয়ে নূরনাহার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'আমার আম্মা ( সুফিয়া খাতুন ) ক্ষুদ্র ঋণের প্রথম গ্রাহক।তাকে দেখিয়ে ইউনুস সাহেব দেশে-বিদেশে অনেক নাম করেছেন,কিন্তু আমাদের কিছুই হয় নি।বেতের তৈরি মোড়াসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরির ব্যবসা করতে আম্মা ওই ঋণ নেন কিন্তু চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকা কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে তাকে হিমশিম খেতে হয়েছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের কিস্তি শোধ করতে আম্মাকে অন্যজনের কাছ থেকে আবার ঋণ নিতে হয়েছিল।'
তখন থেকে এ পর্য্যন্ত সুফিয়া খাতুনের পরিবারের কোনো সদস্য গ্রামীণ ব্যাংক থেকে আর ঋণ নেন নি।সুফিয়া খাতুনের দারিদ্র্যতাকে পুঁজি করে দশ-বিদেশে ডঃ ইউনুস অনেক সম্মান ও মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অনুদান পেয়েছেন কিন্তু সুফিয়া বেগমের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আজ অবধি ঘটেনি।
নোবেল পুরস্কার পাবার পর ডঃ ইউনুস এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেঞ্জোবরা গ্রামে এসেছিলেন। সে সময় অনেক চেষ্টা করেও সুফিয়া খাতুনের পরিবারের সদস্যরা কেউ তাঁর সাথে দেখা করতে পারে নি।সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য যে,ডঃ ইউনুস নোবেল পুরস্কার পাবার পর প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের স্থানীয় গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সুফিয়া খাতুনের বাড়ীর পার্শ্ববর্তী পাকা দোতলা দালান (যার মালিক সুফিয়া খাতুনের ভাইপো আবুধাবী প্রবাসী জেবল হোসেন) দেখিয়ে প্রচার করে যে,এটি পরলোকগতা সুফিয়া খাতুনের।
গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অবস্থার উন্নতি করতে না পারা আরেকজন জোবরা গ্রামের মোহাম্মদ হানিফ।তিনি গত ১৯৮৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ২০০০ (দুই হাজার) টাকা ঋণ নিয়ে একটি গরু কিনেছিলেন কিন্তু নিয়মিত কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পেরে সেই গরু বিক্রি করে সাত মাসে ২৮০০ (দুই হাজার আট শ') টাকা পরিশোধ করে ঋণমুক্ত হন তিনি।(সূত্রঃবিডিনিউজ২৪)।
গ্রামীণ ব্যাংকের কিস্তি শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যাঃ
কেস হিস্ট্রি-০১:
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে কিস্তির টাকা দিতে না পেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কালু মিয়া (৫০)। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করেছে। জানা গেছে, বেগমগঞ্জ উপজেলার গণিপুর গ্রামের খোকা মিয়ার বাড়ির কালু মিয়া চৌমুহনী রেলওয়ে গেইট এলাকায় ক্ষুদ্র চা দোকানের ব্যবসা করতেন। দোকানের পুঁজি কম থাকায় সে গ্রামীণ ব্যাংক চৌমুহনী শাখা থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেয়। সে টাকার কিছু অংশ পরিশোধ করলেও সাংসারিক টানা-পোড়েনের কারণে কিস্তির বাকি টাকা ঠিকমতো শোধ দিতে পারছিলেন না।
আজ সকালে কিস্তির টাকার জন্য ব্যাংকের ঋণ আদায়কারী অফিসার তাকে শাসিয়ে যায়। এরপর দুপুর ১২টার দিকে কালু মিয়া বাড়ির পাশের জামে মসজিদ সংলগ্ন মক্তবের ঘরের আড়ার সাথে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।খবর পেয়ে পুলিশ দুপুর ১টায় সেখানে গিয়ে গলায় দড়ি পেছানো অবস্থায় লাশটি উদ্ধার করে। নিহত কালু মিয়ার স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে রয়েছে।(সূত্রঃ২৫ ফেব্রুয়ার,শীর্ষ নিউজ ডটকম)
কেস হিস্ট্রি-0২:কলারোয়া উপজেলার জলাবদ্ধ এলাকার পাকুড়িয়া গ্রামের রেখা রানী বিশ্বাস (৪০) কিস্তি দিতে না পেরে গ্রামীণ ব্যাংকের মাঠকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ঋণী সদস্য মারা গেলে তার কিস্তি কে দেয়। মাঠকর্মী বলেছিলেন, তার ঋণ মাফ করে দেওয়া হয়। পরের দিন অর্থাৎ শুক্রবার ভোরে পাকুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রের পাশে কাঁঠাল গাছে রেখা রানী বিশ্বাসের ঝুলন্ত লাশ দেখা যায়।(সূত্রঃ২রা নভেম্বর,১০ দৈনিক সমকাল)
কেসহিস্ট্রি-০৩:অভাব-অনটনের সাথে লড়াই করে হেরে গেলেন হরিলাল। ঋণের দায় এড়াতে উপায়ন্তর না পেয়ে অবশেষে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এ ব্যক্তি। চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনাটি ঘটেছে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায়। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার ছিল ব্র্যাকের ৩০০ টাকার কিস্তি ও আগামী রোববার গ্রামীণ ব্যাংকের ৭৬৫ টাকার সাপ্তাহিক কিস্তির দিন। গতকাল পর্যন্ত ওই টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়ে হরিলাল দেবনাথ নিজ ঘরের চালের সাথে গলায় রশি লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। হরিলালের স্ত্রী অর্চনা দেবনাথ ও বাড়ির লোকজন জানান, পার্শ্ববর্তী মিরশ্বরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ বাজারের ফুটপাথে হাতে তৈরি পাখা, ঝাড়ু, কুলা ইত্যাদি বিক্রি করে কোনো রকমে স্ত্রী আর পাঁচ কন্যা সন্তানের সংসার চালাতেন হরিলাল। দুই বছর আগে বড় মেয়ে ফুলেশ্বরী দেবনাথকে বিয়ে দিতে গ্রামীণ ব্যাংক, দারোগারহাট শাখা থেকে ২৯ হাজার টাকা ও ব্র্যাক থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নেন তিনি। সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা দিতে অপর দুই মেয়েকে চট্টগ্রামে একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরিতে দেন। সম্প্রতি তারা চাকরি হারিয়ে বাড়ি ফিরে এলে সংসারে ভোগান্তি বেড়ে যায়। এনজিও’র কিস্তি শোধে গ্রামের লোকজন থেকে চড়া সুদে আরো ঋণ নেন তিনি। বহুমুখী ঋণের চাপে আর পরিবারের অনটন সইতে না পেরে অবশেষে হরিলাল আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। গ্রামীণ ব্যাংকের শাখা ম্যানেজার তোফাজ্জল হোসেন তরফদার বলেন, শুধু গ্রামীণ ব্যাংক থেকে নয়, হরিলাল বিভিন্ন জায়গা থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন। ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম জানান, তিনি সকালে ইউপি মেম্বারের মাধ্যমে হরিলালের আত্মহত্যার খবর জেনেছেন।(সুত্রঃদৈনিক নয়াদিগন্ত,২৪.১০.০৮)
ইউনুস ফাঁদে দরিদ্ররা: সম্প্রতি দারিদ্র দূর করতে বিদেশ থেকে অনুদান পাওয়া কোটি কোটি ডলারের মধ্যে ১০ কোটি অর্থাৎ প্রায় ৭০০কোটি টাকা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরানোর অভিযোগ করেছে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন (এনআরকে)।এ্নআরকে এর প্রামাণ্যচিত্র 'ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে'। ক্ষুদ্র ঋণ কার্য্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের গরীব মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নীচ থেকে তুলে আনাই ছিল এ অনুদানের উদ্দেশ্য। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোনাথন মরডাকের দেয়া তথ্যানুযায়ী,ওই সময়ে ভর্তুকি হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংক প্রায় ১৭.৫ কোটি ডলার পেয়েছিল। ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে' শীর্ষক প্রামান্যচিত্রে অভিযোগ করা হয়,দারিদ্র্য দূর করার জন্যে ভর্তুকি হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককে ১৯৯৬ সালে বিপূল পরিমাণ অর্থ দেয় ইউরোপের কয়েকটি দেশ। নরওয়ে, সুইডেন,নেদারল্যান্ড ও জার্মানীর দেয়া অনুদান থেকে ৭০০ কোটি টাকা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে গ্রামীন কল্যাণ নামে নিজের অন্য এক প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেন ডঃ ইউনুস।বাংলাদেশ নরওয়ের দূতাবাস,নরওয়ের দাতা সংস্থা নোরাড এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এ অর্থ গ্রামীণ ব্যাংকে ফেরৎ নিতে চেয়েও পারেনি।খানে উল্লেখ্য,নরওয়ের দাতা সংস্হা ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্য্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংককে ৪০ কোটি ডলার অনুদান দেয়।১০ কোটি ডলারের মধ্যে ৭ কোটিরও বেশী ডলার ডঃ ইউনুসের গ্রামীণ কল্যাণ নামের প্রতিষ্ঠানেই থেকে যায়। পরে বাংলাদেশ নরওয়ের দূতাবাস,নরওয়ের দাতা সংস্থা নোরাড এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালণ করে।আরো ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে,গ্রামীণ ব্যাংকের ওই অর্থ গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে নেয় গ্রামীণ ব্যাংক।
প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতা টম হেইনম্যান অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য ডেনিশ এ্যাসোসিয়শন অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম তাঁকে ২০০৭ সালে বিশেষ পুরস্কার দেয়।প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের জন্যে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছিলেন।অর্থ স্থানান্তর ও ঋণের বেড়াজালের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ডঃ ইউনুসের মতামত জানতে প্রায় ছয়মাস ধরে তিনি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করেও পান নি।ডঃ মুহম্মদ ইউনুস টম হেইনম্যানকে কোনো সময় দেন নি বা দেখা করতে রাজী হন নি।
গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থ গ্রামীন কল্যাণে স্থানান্তের বিষয়টি জানতে পেরে নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থা 'নোরাড' এ বিষয়ে প্রশ্ন তুললে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাতা ডঃ ইউনুস এর ব্যাখ্যা দেন।অর্থ সরিয়ে নেয়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি ১৯৯৮ সালের ০৮ জানুয়ারী একটি চিঠি লেখেন।অই চিঠিতে বলা হয়,'এর মূল উদ্দেশ্য করের পরিমাণ কমানো এবং গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা। এ অর্থ রিভলভিং ফান্ড হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় থেকে গেলে ক্রমেই বাড়তে থাকা কর হারের কারণে ভবিষ্যতে আমাদের বিপূল পরিমান কর পরিশোধ করতে হবে।রিভলভিং ফান্ড থেকে কোনো অর্থ ব্যয়ের পর এর বিনিময়ে পাওয়া অথ আবার একই কাজে ব্যবহার করা যায়। এ তহবিলের ক্ষেত্রে অথ বছর বিবেচিত হয় না।
অর্থ স্থানান্তের ঘটনা যাতে প্রকাশ না পায় সে বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন ডঃ ইউনুস।নোরাডের তখনকার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে ১৯৯৮ সালের ০১ জানুয়ারী এক চিঠিতে তিনি লেখেন,'আপনার সাহায্য দরকার আমার।।...সরকার এবং সরকারের বাইরের মানুষ বিষয়টি জানতে পারলে আমাদের সত্যিই সমস্যা হবে।'
নরওয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়াঃটম হেইনম্যানের 'ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে' প্রামান্যচিত্রটিতে ঋণের জন্যে দেয়া অনুদানের অর্থ অন্যখাতে স্থানান্তরের বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নরওয়ের লেবার ও প্রগ্রেস পার্টির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্যরা।লেবার দলের সদস্য ক্রিস্টিন হানসেন বলেন,'বিষয়টি আমাদের কাছে নূতন।সব তথ্য-উপাত্ত অবশ্যই উপস্থাপন করতে হবে।এ ধরণের বিষয় গোপন রাখা মেনে নেয়া যায় না।'প্রগেস পার্টির সদস্য মরটেন হগল্যান্ড বলেন,'এ ঘটনার বিষয়ে সংসদে কোনো তথ্য জানানো হয় নি।এটি বিরক্তিকর।পূরো ঘটনা খতিয়ে দেখতে হবে।তদন্তের জন্যে যাচাই-বাছাই ও সংসদীয় কমিটির পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ।'
নরওয়ে সরকারের সহায়তা বিষয়ক মন্ত্রী এরিক সোলহেম এ ঘটনায় যে কোনো তদন্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন,'সাহায্যের জন্যে দেয়া তহবিল চুক্তির শর্তের বাইরে অন্য খাতে ব্যবহারের সুযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। মন্ত্রী ১৯৯৮ সালে ঘটনাটি উদঘাটনের পরও তথ্য গোপণ রাখার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলেন,উন্নয়ন তহবিল কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সে বিষয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা থাকতে হবে।'
ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতাদের গল্পঃ
'ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে' প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতারা গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে গেছেন বেশ কয়েকবার। জোবরা গ্রামে তাদের মধ্যে দেখা হয় গ্রামীণ ব্যাংক থেকে প্রথম ঋণ নেওয়া সুফিয়ার মেয়ের সঙ্গে। যশোরের 'হিলারি পল্লী'তে তাদের দেখা হয় গরিব মানুষদের সঙ্গে, ক্ষুদ্র ঋণের কারণে তাদের ঋণের বোঝা শুধুই বেড়েছে বলে দেখতে পান নির্মাতারা। ওই পল্লীতে গিয়ে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতি তার সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছিলেন সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। এ সময় ঋণগ্রহীতাদের প্রায় সবার মুখে একই কথা শুনেছেন প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতারা। তারা জানান, প্রত্যেকেই একাধিক ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। সে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে সবারই প্রাণান্ত অবস্থা। কেউ বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন ঋণ শোধের জন্য। আবার ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি শোধ করতে না পারায় কারও ঘরের টিন খুলে নিয়ে গেছে ঋণদাতা ।
১০ বছর ধরে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য এমন ৪০ জন নারীর ওপর ডেভিড গিবসন ও হেলেন টডের এক জরীপে দেখা গেছে অই নারীদের প্রত্যেকেই গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে পূণরায় ঋণ নিয়েছেন।গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে তারা দ্বারস্থ হয়েছে ব্র্যাকের কাছে,ব্র্যাকের ঋণ পরিশোধের জন্যে আশা'র কাছে ঋণ নিয়েছেন,আশা'র ঋণ শোধ করার জন্যে প্রশিকা'র সদস্য হয়ে ঋণ নিয়েছেন,আবার গ্রামীণ ব্যাংক.....অর্থাৎ গ্রামীণ ব্যংক>ব্র্যাক>আশা>প্রশিকা>গ্রামীণ ব্যংক....আমৃত্যু এক চক্রে আবদ্ধ।
সুদের উচ্চহারঃ২৫০০ জন দরিদ্র মানুষের ওপর ২০০৭ সালে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদদের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়--- এদের এক তৃতীয়াংশ লোক গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন।বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার ২৬% থেকে ৩১%।কোনো কোনো ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের সুদের হার এর চেয়েও অনেক বেশী।গবেষণায় দেখা যায়,সারা বিশ্বে ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুদের হার কোথাও কোথাও ১০০% এমনকি ২০০% ভাগও রয়েছে।
টম হেইনম্যানের 'ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে' বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষকের সাক্ষাৎকারও রয়েছে।এঁরা দী্ঘদিন ধরে ক্ষুদ্র ঋণের বৃহৎ সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন।ডেভিড রডম্যান,জোনাথন মারডক,টমাস ডিক্টার এবং মিলফোর্ড বেটম্যানের মতো সমজবিজ্ঞানীদের সবার একটাই কথা,চালু হবার পর ৩৫ বছরেও এখনো এমন কোন প্রমাণ নেই,যাতে মনে হতে পারে ক্ষুদ্র ঋণ গরীব মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে পারে।
ডঃ ইউনুসের কর প্রদানে অনীহাঃদীর্ঘ কয়েকযুগে গ্রামীণ ব্যাংক একটি শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলেও ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতি এরশাদের জারী করা এক অধ্যাদেশ বলে জন্ম নেয়া গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দারিদ্র্যমুক্তির প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককে করের আওতামুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন ডঃ ইউনুস। এরশাদের শাষনামাল থেকে শুরু করে পরবর্তী কোন সরকারই এ প্রতিষ্ঠানের করমুক্তির আবেদন অগ্রাহ্য করেন নি।কালের কন্ঠে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যায়,৩১ ডিসেম্বর গ্রামীণ ব্যাংকের করমুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ডঃ ইউনুস সরকারের কাছে পরের দুই বছরের জন্যে করমুক্তি চেয়ে আবেদন করে রেখেছেন।তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর পক্ষে এখন পর্য্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া হয় নি।
২০০৬ সালে ডঃ ইউনুস নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর নোবেল পুরস্কারের অর্থের ওপর যাতে করারোপ না করা হয় সেজন্যে নানামুখী তৎপরতা চালান।২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ডঃ এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলামকে নোবেল কমিটির পক্ষ হতে এক চিঠিতে ডঃ ইউনুস ও তাঁর গ্রামীণ ব্যংকের পাওয়া নোবেল পুরস্কারের অথ করমুক্ত রাখার জন্যে অনুধ জানানো হয় যদিও চিঠিতে বলা হয়ছিল, যুক্ত্ররাষ্ট্রেও নোবেল পুরস্কারের অর্থ করমুক্ত নয়।নোবেল কমিটির পর ডঃ ইউনুসও নোবেল পুরস্কারের অর্থ করারোপ না করার জন্যে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ডঃ এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের কাছে আবেদন করেন এবং নোবেল পুরস্কারের অর্থ করমুক্ত করতে সক্ষম হন।
নিয়মনীতি মানেন না ডঃ ইউনুসঃগ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নিয়মনীতি মানেন না ডঃ ইউনুস। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমাল অনুযায়ী এমডি পদের চাকুরীর সর্বোচ্চ বয়স ৬৫ হলেও তিনি সমস্ত নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ৭৫ বছর বয়স পার করেও গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ আকঁড়ে ধরো আছেন এবং এমডি পদটি সার্বক্ষনিক হলেও তিনি বছরের অধিকাংশ সময়ই দেশের বাইরে কাটান ফলে গ্রামীন ব্যাংকের আভ্যন্তরীন কোন সিদ্ধান্তও ঝুলে থাকে দীর্ঘদিন।গত বছর এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালিখি হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে এমডি পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিলেও তিনি তা গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন নি।বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর তাঁকে ডেকেও পান না---এমন অভিযোগও তাঁর বি্রুদ্ধে রয়েছে।
উপসংহারঃঅর্থনীতি কিংবা দারিদ্র্যের ইতিহাসে ডঃ মুহম্মদ ইউনুস চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তাঁর অভিনব আবিষ্কারের জন্যে।পশ্চিমা বাঘা বাঘা ডক্টরেট ডিগ্রধারীরা যা পারেন নি আমাদের ডঃ মুহম্মদ ইউনুস তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে,শুধু টাকাওয়ালা ধনী কিংবা মধ্যবিত্ত্ব শ্রেণীই নয় হত-দরিদ্রেরও কিভাবে শোষণ করা যায় তাদের ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে ফেলে, তাদের ভোগ-লালসা সৃষ্টি করে কিভাবে ২৬% থেকে ৩১% শোষণ করা যায়। তাঁর শোষণের অভিনব ফর্মুলা প্রায় ৩৫ বছর ধরে চলমান। আর কতকাল টিকে থাকবে তা ভবিতব্যই বলতে পারে?
সর্বশেষঃমুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক থেকে কোটি কোটি ডলার সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নরওয়ে সরকার যাচাই করছে বলে বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে।( এ লেখার সময়কালঃ০৩.১২.১০ সন্ধ্যা ০৬.০০ মিঃ)।
http://www.bangladeshnews24x7.com/editorial-page/comments/331-2010-12-03-13-24-16.html
দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে জোবরা গ্রামের সিকদার পাড়ার অভাবী নারী সুফিয়া খাতুনের হাতে প্রথমে ২০(কুড়ি) টাকা ঋণ তুলে দেন তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ মুহম্মদ ইউনুস এবং পরবর্তীতে বেশী ঋণের আশ্বাস পেয়ে নির্ধারীত সময়ের আগেই ঋণ পরিশোধ করে দেন সুফিয়া বেগম এবং নূতন করে ঋণ পান ৫০০(পাঁচশত) টাকা।একসঙ্গে এত টাকা পাওয়ার আনন্দে সুফিয়া খাতুন তা সারা গ্রামে জানিয়ে দেন এবং এর অল্পদিনের মধ্যেই পূরো গ্রাম চলে আসে ডঃ ইউনুস মুহম্মদের খপ্পড়ে অর্থাৎ ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের আওতায়।জোবরার ঘরে ঘরে তখন নগদ টাকার উৎসব।কিন্তু এ উৎসব ফিকে হতে বেশীদিন লাগেনি।সুদে-আসলে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে সর্বশান্ত হয়েছেন অনেকে,এলাকা ছেড়েছেন রহিমা ও সায়েরা খাতুনসহ কেউ কেউ।
সুফিয়া খাতুনের দুই মেয়ে হালিমা ও নূরনাহারের দিন কাটে এখন অনাহারে-অর্ধাহারে।গ্রামীণ ব্যাংকের প্রথম ঋণ গ্রহীতা সুফিয়া খাতুনের বাড়ীতে পাঁচ কাঠা জমির ওপর হালিমা ও নূরনাহারের পৃথক দু'টো ভিটে।তাদের চাষাবাদযোগ্য আর কোনো জমি নেই।সুফিয়া খাতুনের মেয়ে নূরনাহার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'আমার আম্মা ( সুফিয়া খাতুন ) ক্ষুদ্র ঋণের প্রথম গ্রাহক।তাকে দেখিয়ে ইউনুস সাহেব দেশে-বিদেশে অনেক নাম করেছেন,কিন্তু আমাদের কিছুই হয় নি।বেতের তৈরি মোড়াসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরির ব্যবসা করতে আম্মা ওই ঋণ নেন কিন্তু চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকা কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে তাকে হিমশিম খেতে হয়েছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের কিস্তি শোধ করতে আম্মাকে অন্যজনের কাছ থেকে আবার ঋণ নিতে হয়েছিল।'
তখন থেকে এ পর্য্যন্ত সুফিয়া খাতুনের পরিবারের কোনো সদস্য গ্রামীণ ব্যাংক থেকে আর ঋণ নেন নি।সুফিয়া খাতুনের দারিদ্র্যতাকে পুঁজি করে দশ-বিদেশে ডঃ ইউনুস অনেক সম্মান ও মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অনুদান পেয়েছেন কিন্তু সুফিয়া বেগমের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আজ অবধি ঘটেনি।
নোবেল পুরস্কার পাবার পর ডঃ ইউনুস এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেঞ্জোবরা গ্রামে এসেছিলেন। সে সময় অনেক চেষ্টা করেও সুফিয়া খাতুনের পরিবারের সদস্যরা কেউ তাঁর সাথে দেখা করতে পারে নি।সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য যে,ডঃ ইউনুস নোবেল পুরস্কার পাবার পর প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের স্থানীয় গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সুফিয়া খাতুনের বাড়ীর পার্শ্ববর্তী পাকা দোতলা দালান (যার মালিক সুফিয়া খাতুনের ভাইপো আবুধাবী প্রবাসী জেবল হোসেন) দেখিয়ে প্রচার করে যে,এটি পরলোকগতা সুফিয়া খাতুনের।
গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অবস্থার উন্নতি করতে না পারা আরেকজন জোবরা গ্রামের মোহাম্মদ হানিফ।তিনি গত ১৯৮৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ২০০০ (দুই হাজার) টাকা ঋণ নিয়ে একটি গরু কিনেছিলেন কিন্তু নিয়মিত কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পেরে সেই গরু বিক্রি করে সাত মাসে ২৮০০ (দুই হাজার আট শ') টাকা পরিশোধ করে ঋণমুক্ত হন তিনি।(সূত্রঃবিডিনিউজ২৪)।
গ্রামীণ ব্যাংকের কিস্তি শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যাঃ
কেস হিস্ট্রি-০১:
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে কিস্তির টাকা দিতে না পেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কালু মিয়া (৫০)। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করেছে। জানা গেছে, বেগমগঞ্জ উপজেলার গণিপুর গ্রামের খোকা মিয়ার বাড়ির কালু মিয়া চৌমুহনী রেলওয়ে গেইট এলাকায় ক্ষুদ্র চা দোকানের ব্যবসা করতেন। দোকানের পুঁজি কম থাকায় সে গ্রামীণ ব্যাংক চৌমুহনী শাখা থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেয়। সে টাকার কিছু অংশ পরিশোধ করলেও সাংসারিক টানা-পোড়েনের কারণে কিস্তির বাকি টাকা ঠিকমতো শোধ দিতে পারছিলেন না।
আজ সকালে কিস্তির টাকার জন্য ব্যাংকের ঋণ আদায়কারী অফিসার তাকে শাসিয়ে যায়। এরপর দুপুর ১২টার দিকে কালু মিয়া বাড়ির পাশের জামে মসজিদ সংলগ্ন মক্তবের ঘরের আড়ার সাথে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।খবর পেয়ে পুলিশ দুপুর ১টায় সেখানে গিয়ে গলায় দড়ি পেছানো অবস্থায় লাশটি উদ্ধার করে। নিহত কালু মিয়ার স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে রয়েছে।(সূত্রঃ২৫ ফেব্রুয়ার,শীর্ষ নিউজ ডটকম)
কেস হিস্ট্রি-0২:কলারোয়া উপজেলার জলাবদ্ধ এলাকার পাকুড়িয়া গ্রামের রেখা রানী বিশ্বাস (৪০) কিস্তি দিতে না পেরে গ্রামীণ ব্যাংকের মাঠকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ঋণী সদস্য মারা গেলে তার কিস্তি কে দেয়। মাঠকর্মী বলেছিলেন, তার ঋণ মাফ করে দেওয়া হয়। পরের দিন অর্থাৎ শুক্রবার ভোরে পাকুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রের পাশে কাঁঠাল গাছে রেখা রানী বিশ্বাসের ঝুলন্ত লাশ দেখা যায়।(সূত্রঃ২রা নভেম্বর,১০ দৈনিক সমকাল)
কেসহিস্ট্রি-০৩:অভাব-অনটনের সাথে লড়াই করে হেরে গেলেন হরিলাল। ঋণের দায় এড়াতে উপায়ন্তর না পেয়ে অবশেষে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এ ব্যক্তি। চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনাটি ঘটেছে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায়। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার ছিল ব্র্যাকের ৩০০ টাকার কিস্তি ও আগামী রোববার গ্রামীণ ব্যাংকের ৭৬৫ টাকার সাপ্তাহিক কিস্তির দিন। গতকাল পর্যন্ত ওই টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়ে হরিলাল দেবনাথ নিজ ঘরের চালের সাথে গলায় রশি লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। হরিলালের স্ত্রী অর্চনা দেবনাথ ও বাড়ির লোকজন জানান, পার্শ্ববর্তী মিরশ্বরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ বাজারের ফুটপাথে হাতে তৈরি পাখা, ঝাড়ু, কুলা ইত্যাদি বিক্রি করে কোনো রকমে স্ত্রী আর পাঁচ কন্যা সন্তানের সংসার চালাতেন হরিলাল। দুই বছর আগে বড় মেয়ে ফুলেশ্বরী দেবনাথকে বিয়ে দিতে গ্রামীণ ব্যাংক, দারোগারহাট শাখা থেকে ২৯ হাজার টাকা ও ব্র্যাক থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নেন তিনি। সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা দিতে অপর দুই মেয়েকে চট্টগ্রামে একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরিতে দেন। সম্প্রতি তারা চাকরি হারিয়ে বাড়ি ফিরে এলে সংসারে ভোগান্তি বেড়ে যায়। এনজিও’র কিস্তি শোধে গ্রামের লোকজন থেকে চড়া সুদে আরো ঋণ নেন তিনি। বহুমুখী ঋণের চাপে আর পরিবারের অনটন সইতে না পেরে অবশেষে হরিলাল আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। গ্রামীণ ব্যাংকের শাখা ম্যানেজার তোফাজ্জল হোসেন তরফদার বলেন, শুধু গ্রামীণ ব্যাংক থেকে নয়, হরিলাল বিভিন্ন জায়গা থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন। ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম জানান, তিনি সকালে ইউপি মেম্বারের মাধ্যমে হরিলালের আত্মহত্যার খবর জেনেছেন।(সুত্রঃদৈনিক নয়াদিগন্ত,২৪.১০.০৮)
ইউনুস ফাঁদে দরিদ্ররা: সম্প্রতি দারিদ্র দূর করতে বিদেশ থেকে অনুদান পাওয়া কোটি কোটি ডলারের মধ্যে ১০ কোটি অর্থাৎ প্রায় ৭০০কোটি টাকা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরানোর অভিযোগ করেছে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন (এনআরকে)।এ্নআরকে এর প্রামাণ্যচিত্র 'ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে'। ক্ষুদ্র ঋণ কার্য্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের গরীব মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নীচ থেকে তুলে আনাই ছিল এ অনুদানের উদ্দেশ্য। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোনাথন মরডাকের দেয়া তথ্যানুযায়ী,ওই সময়ে ভর্তুকি হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংক প্রায় ১৭.৫ কোটি ডলার পেয়েছিল। ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে' শীর্ষক প্রামান্যচিত্রে অভিযোগ করা হয়,দারিদ্র্য দূর করার জন্যে ভর্তুকি হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককে ১৯৯৬ সালে বিপূল পরিমাণ অর্থ দেয় ইউরোপের কয়েকটি দেশ। নরওয়ে, সুইডেন,নেদারল্যান্ড ও জার্মানীর দেয়া অনুদান থেকে ৭০০ কোটি টাকা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে গ্রামীন কল্যাণ নামে নিজের অন্য এক প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেন ডঃ ইউনুস।বাংলাদেশ নরওয়ের দূতাবাস,নরওয়ের দাতা সংস্থা নোরাড এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এ অর্থ গ্রামীণ ব্যাংকে ফেরৎ নিতে চেয়েও পারেনি।খানে উল্লেখ্য,নরওয়ের দাতা সংস্হা ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্য্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংককে ৪০ কোটি ডলার অনুদান দেয়।১০ কোটি ডলারের মধ্যে ৭ কোটিরও বেশী ডলার ডঃ ইউনুসের গ্রামীণ কল্যাণ নামের প্রতিষ্ঠানেই থেকে যায়। পরে বাংলাদেশ নরওয়ের দূতাবাস,নরওয়ের দাতা সংস্থা নোরাড এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালণ করে।আরো ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে,গ্রামীণ ব্যাংকের ওই অর্থ গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে নেয় গ্রামীণ ব্যাংক।
প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতা টম হেইনম্যান অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য ডেনিশ এ্যাসোসিয়শন অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম তাঁকে ২০০৭ সালে বিশেষ পুরস্কার দেয়।প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের জন্যে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছিলেন।অর্থ স্থানান্তর ও ঋণের বেড়াজালের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ডঃ ইউনুসের মতামত জানতে প্রায় ছয়মাস ধরে তিনি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করেও পান নি।ডঃ মুহম্মদ ইউনুস টম হেইনম্যানকে কোনো সময় দেন নি বা দেখা করতে রাজী হন নি।
গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থ গ্রামীন কল্যাণে স্থানান্তের বিষয়টি জানতে পেরে নরওয়ের উন্নয়ন সংস্থা 'নোরাড' এ বিষয়ে প্রশ্ন তুললে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাতা ডঃ ইউনুস এর ব্যাখ্যা দেন।অর্থ সরিয়ে নেয়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি ১৯৯৮ সালের ০৮ জানুয়ারী একটি চিঠি লেখেন।অই চিঠিতে বলা হয়,'এর মূল উদ্দেশ্য করের পরিমাণ কমানো এবং গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা। এ অর্থ রিভলভিং ফান্ড হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় থেকে গেলে ক্রমেই বাড়তে থাকা কর হারের কারণে ভবিষ্যতে আমাদের বিপূল পরিমান কর পরিশোধ করতে হবে।রিভলভিং ফান্ড থেকে কোনো অর্থ ব্যয়ের পর এর বিনিময়ে পাওয়া অথ আবার একই কাজে ব্যবহার করা যায়। এ তহবিলের ক্ষেত্রে অথ বছর বিবেচিত হয় না।
অর্থ স্থানান্তের ঘটনা যাতে প্রকাশ না পায় সে বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন ডঃ ইউনুস।নোরাডের তখনকার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে ১৯৯৮ সালের ০১ জানুয়ারী এক চিঠিতে তিনি লেখেন,'আপনার সাহায্য দরকার আমার।।...সরকার এবং সরকারের বাইরের মানুষ বিষয়টি জানতে পারলে আমাদের সত্যিই সমস্যা হবে।'
নরওয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়াঃটম হেইনম্যানের 'ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে' প্রামান্যচিত্রটিতে ঋণের জন্যে দেয়া অনুদানের অর্থ অন্যখাতে স্থানান্তরের বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নরওয়ের লেবার ও প্রগ্রেস পার্টির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্যরা।লেবার দলের সদস্য ক্রিস্টিন হানসেন বলেন,'বিষয়টি আমাদের কাছে নূতন।সব তথ্য-উপাত্ত অবশ্যই উপস্থাপন করতে হবে।এ ধরণের বিষয় গোপন রাখা মেনে নেয়া যায় না।'প্রগেস পার্টির সদস্য মরটেন হগল্যান্ড বলেন,'এ ঘটনার বিষয়ে সংসদে কোনো তথ্য জানানো হয় নি।এটি বিরক্তিকর।পূরো ঘটনা খতিয়ে দেখতে হবে।তদন্তের জন্যে যাচাই-বাছাই ও সংসদীয় কমিটির পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ।'
নরওয়ে সরকারের সহায়তা বিষয়ক মন্ত্রী এরিক সোলহেম এ ঘটনায় যে কোনো তদন্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন,'সাহায্যের জন্যে দেয়া তহবিল চুক্তির শর্তের বাইরে অন্য খাতে ব্যবহারের সুযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। মন্ত্রী ১৯৯৮ সালে ঘটনাটি উদঘাটনের পরও তথ্য গোপণ রাখার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলেন,উন্নয়ন তহবিল কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সে বিষয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা থাকতে হবে।'
ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতাদের গল্পঃ
'ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে' প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতারা গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে গেছেন বেশ কয়েকবার। জোবরা গ্রামে তাদের মধ্যে দেখা হয় গ্রামীণ ব্যাংক থেকে প্রথম ঋণ নেওয়া সুফিয়ার মেয়ের সঙ্গে। যশোরের 'হিলারি পল্লী'তে তাদের দেখা হয় গরিব মানুষদের সঙ্গে, ক্ষুদ্র ঋণের কারণে তাদের ঋণের বোঝা শুধুই বেড়েছে বলে দেখতে পান নির্মাতারা। ওই পল্লীতে গিয়ে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতি তার সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছিলেন সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। এ সময় ঋণগ্রহীতাদের প্রায় সবার মুখে একই কথা শুনেছেন প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতারা। তারা জানান, প্রত্যেকেই একাধিক ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। সে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে সবারই প্রাণান্ত অবস্থা। কেউ বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন ঋণ শোধের জন্য। আবার ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি শোধ করতে না পারায় কারও ঘরের টিন খুলে নিয়ে গেছে ঋণদাতা ।
১০ বছর ধরে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য এমন ৪০ জন নারীর ওপর ডেভিড গিবসন ও হেলেন টডের এক জরীপে দেখা গেছে অই নারীদের প্রত্যেকেই গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে পূণরায় ঋণ নিয়েছেন।গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে তারা দ্বারস্থ হয়েছে ব্র্যাকের কাছে,ব্র্যাকের ঋণ পরিশোধের জন্যে আশা'র কাছে ঋণ নিয়েছেন,আশা'র ঋণ শোধ করার জন্যে প্রশিকা'র সদস্য হয়ে ঋণ নিয়েছেন,আবার গ্রামীণ ব্যাংক.....অর্থাৎ গ্রামীণ ব্যংক>ব্র্যাক>আশা>প্রশিকা>গ্রামীণ ব্যংক....আমৃত্যু এক চক্রে আবদ্ধ।
সুদের উচ্চহারঃ২৫০০ জন দরিদ্র মানুষের ওপর ২০০৭ সালে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদদের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়--- এদের এক তৃতীয়াংশ লোক গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন।বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার ২৬% থেকে ৩১%।কোনো কোনো ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের সুদের হার এর চেয়েও অনেক বেশী।গবেষণায় দেখা যায়,সারা বিশ্বে ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুদের হার কোথাও কোথাও ১০০% এমনকি ২০০% ভাগও রয়েছে।
টম হেইনম্যানের 'ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে' বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষকের সাক্ষাৎকারও রয়েছে।এঁরা দী্ঘদিন ধরে ক্ষুদ্র ঋণের বৃহৎ সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন।ডেভিড রডম্যান,জোনাথন মারডক,টমাস ডিক্টার এবং মিলফোর্ড বেটম্যানের মতো সমজবিজ্ঞানীদের সবার একটাই কথা,চালু হবার পর ৩৫ বছরেও এখনো এমন কোন প্রমাণ নেই,যাতে মনে হতে পারে ক্ষুদ্র ঋণ গরীব মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে পারে।
ডঃ ইউনুসের কর প্রদানে অনীহাঃদীর্ঘ কয়েকযুগে গ্রামীণ ব্যাংক একটি শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলেও ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতি এরশাদের জারী করা এক অধ্যাদেশ বলে জন্ম নেয়া গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দারিদ্র্যমুক্তির প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককে করের আওতামুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন ডঃ ইউনুস। এরশাদের শাষনামাল থেকে শুরু করে পরবর্তী কোন সরকারই এ প্রতিষ্ঠানের করমুক্তির আবেদন অগ্রাহ্য করেন নি।কালের কন্ঠে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যায়,৩১ ডিসেম্বর গ্রামীণ ব্যাংকের করমুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ডঃ ইউনুস সরকারের কাছে পরের দুই বছরের জন্যে করমুক্তি চেয়ে আবেদন করে রেখেছেন।তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর পক্ষে এখন পর্য্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া হয় নি।
২০০৬ সালে ডঃ ইউনুস নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর নোবেল পুরস্কারের অর্থের ওপর যাতে করারোপ না করা হয় সেজন্যে নানামুখী তৎপরতা চালান।২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ডঃ এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলামকে নোবেল কমিটির পক্ষ হতে এক চিঠিতে ডঃ ইউনুস ও তাঁর গ্রামীণ ব্যংকের পাওয়া নোবেল পুরস্কারের অথ করমুক্ত রাখার জন্যে অনুধ জানানো হয় যদিও চিঠিতে বলা হয়ছিল, যুক্ত্ররাষ্ট্রেও নোবেল পুরস্কারের অর্থ করমুক্ত নয়।নোবেল কমিটির পর ডঃ ইউনুসও নোবেল পুরস্কারের অর্থ করারোপ না করার জন্যে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ডঃ এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের কাছে আবেদন করেন এবং নোবেল পুরস্কারের অর্থ করমুক্ত করতে সক্ষম হন।
নিয়মনীতি মানেন না ডঃ ইউনুসঃগ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নিয়মনীতি মানেন না ডঃ ইউনুস। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমাল অনুযায়ী এমডি পদের চাকুরীর সর্বোচ্চ বয়স ৬৫ হলেও তিনি সমস্ত নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ৭৫ বছর বয়স পার করেও গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ আকঁড়ে ধরো আছেন এবং এমডি পদটি সার্বক্ষনিক হলেও তিনি বছরের অধিকাংশ সময়ই দেশের বাইরে কাটান ফলে গ্রামীন ব্যাংকের আভ্যন্তরীন কোন সিদ্ধান্তও ঝুলে থাকে দীর্ঘদিন।গত বছর এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালিখি হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে এমডি পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিলেও তিনি তা গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন নি।বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর তাঁকে ডেকেও পান না---এমন অভিযোগও তাঁর বি্রুদ্ধে রয়েছে।
উপসংহারঃঅর্থনীতি কিংবা দারিদ্র্যের ইতিহাসে ডঃ মুহম্মদ ইউনুস চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তাঁর অভিনব আবিষ্কারের জন্যে।পশ্চিমা বাঘা বাঘা ডক্টরেট ডিগ্রধারীরা যা পারেন নি আমাদের ডঃ মুহম্মদ ইউনুস তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে,শুধু টাকাওয়ালা ধনী কিংবা মধ্যবিত্ত্ব শ্রেণীই নয় হত-দরিদ্রেরও কিভাবে শোষণ করা যায় তাদের ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে ফেলে, তাদের ভোগ-লালসা সৃষ্টি করে কিভাবে ২৬% থেকে ৩১% শোষণ করা যায়। তাঁর শোষণের অভিনব ফর্মুলা প্রায় ৩৫ বছর ধরে চলমান। আর কতকাল টিকে থাকবে তা ভবিতব্যই বলতে পারে?
সর্বশেষঃমুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক থেকে কোটি কোটি ডলার সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নরওয়ে সরকার যাচাই করছে বলে বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে।( এ লেখার সময়কালঃ০৩.১২.১০ সন্ধ্যা ০৬.০০ মিঃ)।
http://www.bangladeshnews24x7.com/editorial-page/comments/331-2010-12-03-13-24-16.html

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন