Powered By Blogger

শুক্রবার, ১২ এপ্রিল, ২০১৩

জলবতী

জলবতী মেয়ে
জলের ওপারে আবাস
ছেঁড়া জালের ফাঁস গলে জলজ স্বপ্নেরা
স্ফীত,স্তম্ভিত প্রদোষকালে কোথায় হারিয়ে যায়
জলের অতলে
নদীর অব্যবহৃত জলে
না কি আলেয়ার তীর ঘেঁষে
উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বাসে ভেসে চলে কচুরীর দাম ঠেলে
এক আধবার মাথা তোলে
সম্রাজ্ঞীর গর্বোদ্ধত অহংকারে

সূর্য আর কাঁশবন সমানুপাতিক দূরত্বে হৃদয় মেলে থাকে
পায়ের পাতায় জলস্পর্শ লেগে আছে,জলবতী মেয়ে
জলের গভীরতম প্রহেলিকা থেকে
দীর্ঘসূত্রীতায় দীর্ঘসূত্রীতায়
সান্ধ্য ঘাটে শব্দ ও স্রোতের মধ্যে
স্মৃতিও বিস্মৃতির অতলে ক্রমশঃ
ডুবে যাচ্ছে শতচ্ছিন্ন জাল আর
ডুব সাতাঁরের প্রাক্কালে তোমার অর্ধনগ্ন স্তন
ঢেকে দেয় নীলচে জলের বুদবুদ

২.
কতদিন মুখোমুখি বসিনি আমরা
অকাতরে ভেসে যেতে দিয়েছি বিমূর্ত সময়ের লগ্ন
মিথ্যের রুপালী আলো ফসফরাসের মতো জ্বলে ওঠে বুকে
ঢেকে দেয় সমস্ত শরীর-মন
বুকের মধ্যে যে ছবি আঁকা ছিল
তার নামও এখন মনে নেই

আপাদমস্তক জুড়ে কেবলই যাওয়ার পালা

ফিরে আসবো? সে পথ প্রতিধ্বনিহীন
আমাকে উগড়ে ফেলে
অস্তিময়ী চেতনাহীন গ্রামের মধ্য রাতের নিষ্ঠুর অবাস্তবতায়
এক রৌদ্রনভস্তল থেকে আরেক অমাবশ্যায়

যেন আমি অযোগ্য পথিক অবেলার সুমন্ত পথের

৩.
কতদিন ছুঁয়ে দেখিনি তোমাকে

ঘুমের সময় কত গল্প জমে থাকত;কখন
চোখ বন্ধ হয়ে আসত সুস্থির শ্বাস-প্রশ্বাসে কেউ-ই
টের পেতাম না পরাভূত অন্ধকারে
স্বপ্নের ভেতর উঠে এসেছিল সেই গান
যে গানের সুর ভুলে গিয়েছিলাম ঘেরাটোপের মধ্যে

বিচিত্র ভাষার কথকতা ঠেলে শুদ্ধ এক ধ্বনি
আমাদের টেনে নিয়েছিল প্রথম সাগরস্নানে
আসন্ন জোয়ারে দীর্ঘ বালুতট শূণ্য পড়ে ছিল
ঝাউবনের তলায় স্ফুট চলাচলে শেষ অস্থিরতা
ডুবে গিয়েছিল সমুদ্দুরের অতলে

আমাদের পূরাতন যে নাম সে নামে ডেকে যায় উত্তুরে বাতাস
পরিযায়ী পাখিরা ফিরবে বলে অপেক্ষায় ছিল হাওরের জলাভূমি
আর কিছু চোরা পাখি শিকারী,___তাদের আশা মিটে গিয়েছিল
গোধূলি বেলায় অনুপম মেঘে মেঘে ডানা ভাঙা পাখির মতোন
সময়েরর কেন্দ্রে উড়ে যাবার প্রাক্কালে
কে যেন জিজ্ঞেস করেছিল,'ক'টা বাজে?'

আমি বলতে পারিনি সময়ের প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে
৪.
'জলবতী,তোমার অতীত নেই।'

নীল সমুদ্র যখন তার প্রমত্ত সঙ্গীতে আমাদের
বিমোহিত করে যায়
ঢেউয়ে ঢেউয়ে প্রতিচ্ছায়া ভাঙে
দুঃস্বপ্নে দুঃস্বপ্নে কাটে অবসিত রাতের প্রহর
আর আমি তোমার আঙুলে জলস্পর্শ করি,___
কারণ সুস্পষ্ট ভাবে জানিঃ
কখন দিগন্তে ডুবে যাবে চন্দ্রাহত আষাঢ়ে পূর্ণিমা

যে সব স্বপ্নেরা কাল ছুটে গিয়েছিল কুয়াশা মোড়ানো পথে
আজ তারা ফিরে এসেছে অনুবর্তিতারুপে
পরিদৃশ্যমান স্বপ্ন ছিল সৃষ্টিরও আগে
আকাশে নক্ষত্র ছিল না তবুও মৃত নক্ষত্রের আলো
আজো ঢুকে পড়ে বুকের ভেতর
হৃতশূণ্যতায় তুমি গেয়ে ওঠ বিরহীবিধুর গান

জলবতী,তোমার অতীত আজ শূণ্যতাময় প্রান্তরে
আদিগন্ত চেনাপথগুলো সব ঢেকে আছে ঝরাপাতাদের অবিমৃশ্য চলাচলে
রোদ কুয়াশা মাখানো সকালের পথ কেবলই ধ্বসে পড়ে পায়ের তলায়
অথবা শিশির লেগে থাকে মৃত মানুষের চোখে,____এই পথেই অনন্ত যাত্রা!
কতদিন ভেবেছি সমস্ত রাত,পুরণো পাতার শব্দে অবলীন বিবশ হয়েছিলাম
এত নিগূঢ় প্রশ্নের কৌতুহলে আমি অটুট দাঁড়িয়ে থাকি জলের কিনার ঘেঁষে
একদিন জেনে নেব,'ডুবসাতাঁরে ডুবসাতাঁরে কতদূর যেতে পারে,জলবতী?'
৬.
প্রদোষকালের অন্ধকারে
জল থেকে গাঢ়তর জলে কেন ডুবে যাও, জলবতী?
জল কি তোমার সব ব্যথা শুষে নেবে?
তবে বালির পাহাড় ভেঙে
ডুবসাঁতারে ডুবসাঁতারে কতদূর যেতে চাও?
গন্তব্যহীন,ডাঙার সজীবতা কি এতোই অবসাদগ্রস্ত?

পরান্মুখ পৃথিবী যখন কেঁপে ওঠে
আমাদের যুগল শিৎকারে।
উন্মত আকাঙ্খা ধ্বসে পড়ে মিলিত দেহের নীচে;
উচ্চকিত প্রেমের আবেশে মগ্ন রাত্রি তার
নিষ্ফলতা ছুঁড়ে দেয় দূরস্খলিত তারার দিকে আর
প্রাকৃতিক দুঃখজটাজাল নিয়ে তুমি নেমে যাও জলের গভীরে
অর্ধনগ্ন শরীর তোমার ঢেকে দেয় নীলচে জলের স্তর।

ভাঙন প্রবল তীরে আমি অটুট দাঁড়িয়ে থাকি।
৭.
জলজ গুল্মেওর মতো কেনে ভেসে যাও,জলবতী
শৈবাল কি সব ব্যাথা বোঝে
ডুবসাঁতারে ডুবসাঁতারে আর কতদূর যেতে চাও
সহজিয়া ভাষা ভুলে
যখন কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকারে সব গ্রাম মিশে এক হয়ে যায়
পাস্তুরিত জাগতিক বোধে

মাছ ধরার বড়শি হাতে ডুবিয়ে দিয়েছি নিরিবিলি,একাকী সময়
জলের গভীরে চোখ রেখে দেখেছি জলের বুদবুদ
নিখাত পাতালছায়া ঘিরে রাখে
কেউ বোঝে না নীলচে স্রোত টেনে নেয় গাঢ়তর পাপ
তোমার চোখের জ্বলজ্বলে ঘৃণা
জলের প্রচ্ছদে অবিরাম ভেসে যায়,ভেসে যায়

কিছুই বলার নেই যদি
হঠাৎ নিজের ছায়া প্রশ্ন করে
আরুঢ় পৃথিবী সূর্যমুখী ফুল ছুঁয়েও দেখে না
প্রহরে প্রহরে তবে কেন নিজের বিরুদ্ধে এত ঘৃণা

যে স্বপ্নেরা একদিন ছুঁয়ে গিয়েছিল চোখের পাতায়
স্বপ্ন ফোঁটার প্রাক্কালে আজ সেখানে নির্ঘুম রাত কাটে
আমার শরীরে লেগে থাকে লোনা জল
যে আকাশ ভরে আছে শূণ্যের ভেতর
তার মধ্য থেকে নেমে আসে ডানাভাঙা হাঁস

রোদ উঠলেই উড়ে যাবে
৮.
নীলচে জলের স্রোত ধূয়ে নেয় কত দুঃখ পাপ
শিল্পের আবেগে তর্কাতীত সকল প্রশ্নের বৃন্তে
আমার অন্যায্য প্রেম অনিবার্য পরিণামে
জলবতীর জলজ দেহ শুষে নেয়

ভূতূড়ে সন্ধ্যায় কালো চুল খুলে দিলে জলবতীর পিঠের প্রান্তে
নেমে আসে রাত্রির জরা-জটিল অন্ধকার
জলের সহজ স্তরগুলো ভেসে যায় চনমনে রক্তের মতোন
জঠরে ফুলের ছায়া---পিঙ্গল কুসুম
পাথরে পাথরে ক্ষয়ে যাওয়া---প্রতিপদের চাঁদ অপলক সব দেখে

এইসব ছবি এঁকে যাবো আজ
ধূ ধূ সৈকতের বালিতে---নদীর বুক থেকে যতোই ডাকুক,জলবতী
আমি শুয়ে থাকব জোছনা বুকে চেঁপে
৯.
যে নদীর ধারে তোমার আবাস---সে নদীর জল অবিরাম প্রশ্নপাতে জর্জরিত করে
নিঃসীম নিঃসঙ্গ শূণ্যতায় কেন কেঁপে ওঠে রাত্রির হৃদয়?তার ফেনায়িত ঢেউয়েরা
পা ভিজিয়ে প্রশ্ন করে,আমি যদি জল থেকেই পৃথক তবে কেন জরাজটিল অরণ্যে
বৃক্ষ নই?ছায়াপথের অজস্র শূণ্যতার মধ্যে খসে পড়া নক্ষত্রের মতো এতো
মূঢ় অভিমান বুকে অপ্রাপনীয়ের অতৃপ্তিতেই কি এই ডানা গুঁজে বসে থাকা?

জলবতীকে ফুলের সাজে সাজানোর জন্যে দু'হাতে ঘুমন্ত খ্রীষ্ট গাছে ফুটে থাকা
ফুলগুলো ছিঁড়েছিলাম তা এই মাতৃসমা জলে কিভাবে ভাসিয়ে দেবো?বোধনের কাল
পার হয়ে গেলে সবুজ পাতার মতো পিচ্ছিল শরীর নিয়ে যদি জলবতী ফিরে আসে
দৃষ্টি নন্দন প্রান্তবেলায়?

১০.
জলের ঘেরাটোপের মধ্য থেকে উঠে এসেছ।শরীরে মৎস্যগন্ধ।
কবিতার ভাষা আর শব্দ,বিন্যাসিত ছন্দ,---
ভেসে যেতে দিয়েছ প্রবল পরাক্রান্ত স্রোতে
চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে জোয়ারের টানে দক্ষিণ,দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে।

বিহিন্দিজালের পাতায় আটকে থাকে আমাদের আত্মজৈবনিক প্রেম।

১১.
জলের নৈকট্যে আর কত,জলবতী
জলে পুড়ে গেছে তোমার শীতল দেহ,
তোমার সৌন্দর্য্যবোধ,গ্রন্থ-অবমাননা---সবই জলে।
জলের ভেতর থেকে চোরা হাতছানি,----
চিৎসাঁতারে চিৎসাঁতারে একদিন নদীর ওপারে চলে যাব।

১২.
নদীর ওপার থেকে কারা হেঁটে আসে?আমি তাদের চিনি না।
তাদের পায়ের জোড়াশব্দ মিলিয়ে যাবার পর শুকতারা উঠে আসে,ধীরপায়ে;
অধিকতর জটিল তার কেশ বিন্যাস।সার্বজনীন ভাবনার মহাকাশে
সান্দ্র সুদূরিমা।মেঘের আড়ালে ইতস্তত শস্যচ্ছবি।
সহজতর স্রোতের অনুগত নৌকা ঠেলে,জলবতী
আজো তোমার পৌঁছুতে দেরী হল।নীলচে জলের স্তরে স্তরে জোঁক ও ছত্রাক,
কন্দফুল ও শামুক,----অনুবর্তিতায় আতপ্ত নিবিড়।

আমাদের খেলা ছিল জলে।আরো দূরে জলের গভীরে স্বচ্ছতার কাচে
শীতল মুখচ্ছবির অবশেষ।চিতাভস্ম,বৈধব্য,উল্কির ছাপ ধুয়ে দেয় নদীজল।
যদি এইখানে কবিতার শেষ আর জীবনের শুরু হত,---
'তুমি কি পাগল?' বলে
জলকেলীতে মেতেছ।

আমি ভুলে যাই সমুদ্র সঙ্গীত,পূর্বজন্ম,কবিতা,দ্বিঘাত রাশিমালা।
একদিন ঠিক
জলের ঐকান্তিকতা থেকে দূরে চলে যাব।


১৩.
এক বৃষ্টির সকালে জলবতী আমাকে দেখিয়েছিল
সেই সব যুবাপুরুষ;অন্তিম সাঁতারের প্রতিযোগী
নদীর জলজ স্রোতে কচুরীপানা,ভাসছে মুখোমুখি,___
শুধু অন্যদের কথা ভেবে উঁচু আশ্রয়ের মাটি থেকে
চারিদিকে জলের প্লাবিত প্রতিরোধে
আমি হিমস্রোত কেটে এগিয়ে গেলাম

প্লাবনের জল উঠে এল ধানক্ষেতে,অন্ধকার সিঁড়ির দরজা খুলে
উঠোনের জমানো জলের বুকে নীল আলো কেঁপে ওঠে

প্লাবিত প্রান্তর,চিরদিনের স্রোতের মূর্ত ভালোবাসা
অপ্রাকৃত ভাষার অন্তরালের উন্মুখর সমাহিত উন্মোচনে
নিমগ্ন নদীর তীর,স্পন্দিত বালির ধূ ধূ আলো
সংশোধিত সকালের কত দেরী,জলবতী
চারণ খড়েরা একদিন শুনেছিলঃসমর্পিত যুগ্মধ্বনি 

১৪.
সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত আজ সব নদীর সহজতর স্রোত,
সব সমর্পন ফেলে কোথায় দাঁড়াবে,জলবতী?
প্রবল বর্ষনে ভাঙে পাড়,ভাঙছে ভাসানের গানে।
আমাদের প্রিয় মিথ্যেগুলো মিশছে দিগন্তপাড়ে,নদীর ঢেউয়ে।
নিজেকে শালপাতায় মুড়ে অর্ঘ্য দিয়েছি,'গ্রহণ করো,দেবী।'

বলে কত রাত অব্দি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি।শুনেছে অন্ধ কবি ও বাউল।
একতারার করুণ সুরে শোনা যায়...।
আলোভাঙা চোখের সজল চাহনীতে বিদায়ের বিদীর্ণ প্রবাল,
তোমার ধারাল মুখ জ্বালিয়ে দিয়েছে সবটুকু সন্ধ্যাবেলা।
নিভৃত ধ্যানের তাপে বিকশিত---কোথায়,একাকী ভালোবাসা?
ঘরের ভেতর এত দীর্ঘকাল কেটে গেল,তবু অন্ধকার ভরা কররেখা,
আকাশে-মাটিতে এত রৌদ্ররশ্মি,রক্তধারা নেমে আসে মেঘ থেকে।

অতীত আসক্তি ভেঙে এতদূর চলে এসেছ,---প্রবাসী নৌকাগুলো
বালু ও পাথরে ভর্তি।আলোকিত স্বরের নৌকাগুলোর অনিঃশেষ যাত্রা।

যদি যেতে চাও তবে জলবতী,শব্দ না করেই খুলে ফেলো খিড়কি দূয়ার। 

১৫. 
ঝলসানো পাখির পালক উড়ে এসে পড়ে শরীরে,পায়ের কাছে
নদীর দু'ধারে কুঁড়ে,পাটকাঠির দেয়াল,
খড়ের ছাউনি,লাউয়ের ডগা,___
আগামী বর্ষায় ভেসে যাবে
এই স্বপ্নে ভেঙে যায় ঘুম।
অন্ধকার থেকে উঠে আসে তরলীকৃত অপমানের স্তুপ।

দূরের জানালা খোলা,আলো এসে পড়ছে,বাইরে।
তোমার দু'চোখে ঘুম লেগে আছে,ঠোঁটের দু'কোণে হাসি
আমার আহত চোখ জ্বলে ওঠে হলুদ পরাগে।
অঘোরময় আকাশে মরা মেঘ,বৃষ্টি নেই
আমরা শূণ্যের অভিবাসী।
মারী ও মড়ক ধূয়ে নেয় প্লাবনের অনিশ্চিত জলরাশি
আর আমার গলিত দেহ বারোমাসি স্রোতে ভেসে গেলে
জলহীন উপবাসে থেকো,সারাবেলা। 

১৬.
পায়ে পায়ে ধ্বংস এগিয়ে আসছে তবু ফিরে আসি
শ্মশাণের দ্বার  থেকে
জ্বলন্ত চিতায় জল ঢেলে নেমে আসি
ডোমের চিৎকার,চডালের হেতালের লাঠি
আমার পেছনে পেছনে দৌড়াতে থাকে

পালিয়ে যে যাব তেমন জায়গা নেই
'আমার দক্ষতা পালানোতে--বলেছিল জলবতী

যমুনার কালো জলে জলবতী সাঁতরায়
তার খোলা পিঠে উঠে বসে কামট,কাছিম
আঙুল হারানো হাতে আমি তুলে নেই কাঁকড়া ও কুঁচো
অন্তিম পাথর থেকে লাফ দেবার মুহূর্তে
আমার মাথার চুলে বেঁকে গিয়েছিল বাতাসে,সীমানাহীন জলে
নেমে এসেছিলাম জলবতীর মাথা কাধে নিয়ে

সেবারই পালাতে পারি নি

১৭.

দরিদ্র প্রয়াসে সকালবেলায় জেগে শুনি কাকের চিৎকার
কাল রাতে স্বপ্ন দেখেছিঃজ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড ঘিরে প্রেতের উচ্ছ্বাস,হাতে নরমুন্ড
একশিলা পাথর;সোমত্থ পুরুষের বুকে
আমরা জেনেছি---সব সমর্পন সমুদ্রের দিকে,রিক্ত নদী শুকিয়ে মরেছে
ঘাটে ঘাটে,বালুচরে আটক নৌকার সারি
ভাঙা বৈঠা শুয়ে,শরীরে রৌদ্রের ঝলসানো তাপ

জল থেকে মুখ তোলো
নীল জলে কালের শ্যাওলা---মুছে যাবে প্রতিপূরণের অহংকারে
পিচ্ছিলতা ভরা সিঁড়িগুলো জলের গভীরে নেমেছিল
গোড়ালিতে সেই সর্বনাশ এখনও লেগে আছে
জনহীন পারে ভিক্ষার অমরবাটি হাতে দাঁড়িয়েছি
ঠিক এমনই কথা ছিল
প্রবল বর্ষণ,উপসাগরের নষ্ট জল----
যতটুকু চেয়েছিলে ডাঙায় তাড়ানো জলচর
আমার চোখের দিকে তাকাও,দেখেছঃ
লবণ ও ঘাম,অজস্র শেকড়-বাকরের আঁকিবুঁকি রেখার ভেতর পথ খোঁজে

সেখানে বৃথাই ধূলি ওড়ে

১৮.

উন্মার্গের গোধূলি,শায়িত সন্ধ্যাবেলা,---
তুমি জলে নেমেছ,রাতের বুকে কর্কট,মিথুন
জল লঙ্ঘনের খেলা ভেঙে
উলঙ্গের সেই আকর্ষণ আজো ঘিরে রেখেছে তোমাকে

জল-জলান্তরে বেড়ে উঠেছে যে লতা
তুমি তার ঘ্রাণ নাও
শৈবালের সন্তান,প্রবাল দ্বীপ,---
সমুদ্রের জলে চিরদিনের ঘূর্ণির টান দূর নক্ষত্রের উন্মীলনে অগ্নির স্ফুলিঙ্গ বহৃৎসবে মেতেছে জ্যোতির্মন্ডল শেষ চুম্বনের মতো নিঃশ্বাস ফুরোলে নক্সাহীন ধূসর পাথরে আলো ফেলে হলদেটে চাঁদ ঔপনিষদিক রাত,যুথবদ্ধ ঝাউগাছ ফিরে যায় ক্লান্ত জোনাকীরা হাঁটু মুড়ে বসে আছ সৈকতের আরুঢ় বালিতে ইহলৌকিকতা ভেঙে স্মৃতি থেকে বিস্মৃতির ভেতরে ক্রমশঃ শব্দ ও স্রোতের উর্ধ্বে উঠে যাচ্ছে দ্ব্যর্থক সময় ১৯. চোখের সামনে আদিগন্ত সমুদ্র,একাকী দাঁড়িয়েছ তীরে সৌর অক্ষর শরীরে,নগ্ন দু'টি হাতে আধভঙা সূর্যকাঁচ পদ্ম বা শালুক --- কেউ জানে নি তমসাতীরে শান্ত গৃহসারির আড়ালে নৌকা আর সাতারুর ঝাঁপে শান্ত জলরাশি শুকিয়ে রক্তাভ দু'পারের বালিয়াড়ি তোমার হাতের রেখা থেকে ঝরে পড়ে জলধারা,রক্তস্রোত সূর্যাস্তের আগে কিংবা পরে উদ্বেগ - সৈকতভূমি - চোখে চোখ থেমে আছে আর অন্য সকলের উজ্ঞাতসারে আমাত পিঠে জ্বলজ্বল করে ওঠে প্রাগৈতিহাসিক দানবের পদচ্ছাপ ২০. আয়না ও আত্মপরিচয় ভেঙে স্তম্ভিত প্রেমিক বুকফাঁটা আর্তনাদে কেঁপে উঠি ভাঙা গানের কলির মতো - সারা ঘরময় রুপান্তর শিশিরের খোঁজে,অশ্রু ও রক্তের খোঁজ়ে ঝকমকে মৌরলা মাছের যে জীবন - জীবনের দীর্ঘতম ফুটপাত জুড়ে বিবর্তনবাদের আলপনা এ এক রহস্য - বোধিবৃক্ষের তলায় ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ গৃহে ফিরে যাবে অধীত জীবন থেকে উড়ে আসে তারবার্তা নির্বাণের শোক ও লিপিতে বহুদুপুরের নিঃসঙ্গতা অন্তর্গত বৃষ্টির ভেতর ধূলো ও পরিপক্ক বেদনা রুপান্তর,বিবর্তনবাদ - অগনন নক্ষত্রের রাত্রি অজ্ঞাত সমুদ্রতীরে প্রণয় দ্বিধার দৃশ্যে অন্তঃস্নান,চুম্বন,জল ও জননের সন্ধানে অসংখ্য যুবকেরা চাঁদ-ডোবা অন্ধকারে শুদ্ধতার তীব্র অভিলাষে পথে নেমেছে - নৈশবিজ্ঞপ্তি এবং ইস্তেহারে লেখা 'ক্ষুধা।মৃত্যু।জ্বরা।শোক।দুঃসময়।রজঃস্বলা নারী।' মন্দাক্রান্তা রাগমোচনের মাত্রাজ্ঞান ও সুরে শূন্যতা রাতের আলো জ্বালে আর অনাথ নদীর বুকে জেগে ওঠে বিভ্রান্তবোধ,বুদ্বুদ - বিচ্ছুরণের মায়াবী রেখা ২১. অতঃপর নদীভর্তি জলের ভেতর ডুবে গেলে আর আমি আকাঙ্খার তীরে ধ্যানমগ্ন হলাম,আমার মাথা থেকে ধোঁয়া নিঃশ্বাসে আগুন - চরাচর ব্যাপ্ত হল দাবদাহে অন্ধকারের ছায়ায় লোকালয় ঘুমিয়ে পড়লে অনন্ত প্রহরী তালগাহের শাখায় ভেসে ওঠে চাঁদ,মেঘ পৃথিবীর জন্ম থেকে অদ্যাবধি - মেঘ ও চাঁদের প্রণয়ে যে পৌরাণিক অভিশাপ জেগেছিল তার তলায় দাঁড়িয়ে আমাদের আদি প্রেম বলেছিলঃ সম্ভোগের কোন শেষ নেই মোহের শরীর থেকে যতটুকু স্বেদবিন্দুঘাম - তুলে এনে ঠোঁটে ধরে রেখেছিলাম;সমস্ত লেখা ও কবিতা মধ্যজলের নৌকায় ফেলে এসেছি অনিষ্টকারী অপ-দেবতার স্তব সাপ,ময়ূর ও ফল হাতে গাছের পাতায় আচ্ছাদিত ঈভের পাশাপাশি ভয়ার্ত আদম উপ্যাখ্যান ক্ষুধার্ত মানবজন্ম,ছায়াপথ,রক্তের পিপাসা,যৌনস্বাদ - জলথেকে ভেসে উঠবে তোমার জলপোড়া দেহ ধ্যানমগ্ন এই আমাকে গ্রহণ করো আমার পৌরষদীপ্ত বীর্যে নিজেকে সিঞ্চিত করো,গর্ভবতী হও স্কুলঘরের খেলার মাঠ আর পথে পথে কেঁদে উঠুক আমার সন্তানেরা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন