শুক্রবার, ২৩ মে, ২০১৪
ধূপের মতোন উড়ে গেছে প্রতিশ্রুত প্রেম
ধূপের মতোন উড়ে গেছে প্রতিশ্রুত প্রেম।জলের স্বভাবে তরলবসনা নারী আমরা সকলে ডুবে আছি হাঁটু,কোমর ও বুকজলে।(মানুষের স্মৃতিও তরল।নিয়ত পরিবর্তনশীল।)সভ্যতা বানিয়েছিল যারা;আমাদের সেই পূর্বপুরুষেরান উদাসীন অক্ষমালা ঘিরে শূন্য প্রতিভার বিকিরণ ও প্রতিফলনে আলোর আরেকপাশে অধিকারহীন মর্যাদা অথবা কলংকরেখার ধারার নিবদ্ধে বেঁধেছিল জীবন।ভূ-প্রদক্ষিন,মরুযাত্রা,বেলাঞ্চলে রৌদ্রময় আভা,চারিদিকে ভাপ।অঘোর চৈতন্যেদয়ে একাকীত্ব,অপেক্ষা ও অন্ধত্বের গানে অনির্দেশিত সংকেত এবং কূটিল স্বার্থের গ্রন্থি---বৈপরীত্যে ভূমি বিভাজন,নদীর নাব্যতা কিন্তু তার চেয়েও দূরহ মানবীর প্রেম ও প্রেমের ফলিত জ্যোতিষরুপ।যে ভৌতবিদ্যায় আঙুরের রসের জারণ,সূর্য্যমুখী ফুল থেকে ভোজ্যতেল এবং সোঁদা মাটির গহ্বর থেকে যব গাছের উৎপত্তি ---তার রহস্য উদঘাটন এবং দূরান্বয়ী নক্ষত্রের আলো প্রকৃতির অন্তর্গত শৃঙ্খলিত স্থিতি ও অস্থিতিসহ সমুদ্র বিধৌত এ-উপত্যকায় মানুষের কোলাহল, শোভাযাত্রা,দূরারোগ্য ব্যাধির হাসপাতালে স্ত্রীলোকের রক্তক্ষরণের উৎসবে পাথর,শিবলিঙ্গ বেয়ে নামছে পানীয় জল।নর্দমার জলে হাঁস,পাশে পড়ে থাকে দুপুরের খোঁড়া রোদ।সমস্ত পাহাড় ভেঙে আসক্তি অতীত ফেলে এতদূর চলে এসেছি যে---ফিরে যাওয়া?সে প্রায় অসম্ভব।গোধূলিবেলার দিকে অনায়াস চলে যাওয়া যুবক,লঘু স্মৃতি,---প্রাণ টলে যায় জীবন্মৃতের মতোন।লাটবাগানের অন্ধকারে বৈধাবৈধের অজস্র চুম্বনের মতো মুক্ত নাভিতটে শ্বাপদের থাবা।পতনোন্মুখ মানবী,পতনের খোলা বুকে কালোরাত নেমে আসে।শরীর ফেরেও যদি,কৃকলাশ চাহনীতে বরফ।আকাশ ভরে যায় ভস্মে।কালো বাতাসের উত্থানে জর্জর বুক।ধর্মত যা দেখা অপরাধ--দেখেছিল এই দুই চোখ অন্ধ হওয়ার আগে।ধারাময় সরীসৃপ তাপদাহে জ্বলছে হৃদয়।মানবী,বোঝ নি চলমান স্রোতে জলের অক্ষরে লেখা কবিতা ও প্রেমগাঁথা।
যদি এইখানে এর শেষ হত,যদি আবার নূতনভাবে অগ্নিময় শোক ও অশ্রুতে লিখে যাই কবিতা,গানের সন্ততির পাশে গলিত হাতের মুঠো খড়কুটো ভরে উঠে আসা---বালুচরে পড়ে আছে ডানাভাঙা হাঁস,ঠোঁটের আদূল কোণে রক্তমাখা কষ....এর কোন শেষ নেই।
২.
ছন্দ শাসিত কবিতা এবং ভাষার ভেতর অনেকান্ত জ্জবনের ত্রাণহীন নীরন্ধ্র কালিমা,প্রেতের দাঁতের ফাকে মরজগতের টুকরো,সাংখ্যের ভেদে প্রকৃতি।পিতৃভূমির অই প্রান্তে শব্দগুলো মুছে আসে।নদীতীরে এসে লাগে ছইহারা নৌকা।ঝাঁকড়া অশ্বথগাছ।শেকড়বাকড়ের নিঃশ্বাসে উঠে আসে অর্বুদ কালের গান।অথচ এ-কথা ঢালু পাড় ভেঙে নেমে আসার সময়ে ছদ্মের সংসারে কানাগলি,মাকড়সা জাল---কেঁপে ওঠে অবৈধতা।সঞ্চারিত ভ্রূণে শকুনের ডানা।অক্ষয় জীবন ফেলে চেয়েছিলাম মুদ্রিত হতে কিন্তু সুমন্দ্রিত বুক জুড়ে কালো বাতাসের উত্থান।ঈশাণ কোণে মেঘ।আমার সঞ্চয় শূন্য।উত্তরাধিকারী আমার সন্তান-সে ও ভেসে গেছে।ইচ্ছে ছিল-বাঁচাতে পারি নি।সেই পাপে গোটা শহর কবিতা এবং শিশুহীন।যা আঁকড়ে বেঁচে আছি;আজ কিংবা আগামীকাল দুর্মর মৃত্যু,মায়াজাল,হোমের আগুন,সামমন্ত্রে ছাড়িয়ে গিয়েছি আলোর আসর।দুই চোখ ডুবে আছে অন্ধকারে।তোমাকে ছুঁয়েছে?ধোঁয়া ও আগুন থেকে হাত তুলেছি---মানস সরোবর থেকে অই দেখ পাখিরা আসছে।অর্ধেক হৃদয় খুলে স্বরব্যঞ্জনে ভাসিয়ে দিয়েছি।নেয় নি জল।অরুন্তুদ চিৎকারে চিৎকারে দশদিক বিদীর্ণ করেছি।শোন নি সে ডাক।জলের আবর্তে ঘেরা জলজ রমণী প্রতিহত সব পথ দুমড়ে মুচড়ে গেছে।ঘোরানো পথের বাঁকে কোজাগরী ইন্দ্রজাল।কুহকের মায়ায় দরজা খুলে বেরিয়ে পড়েছ?চৌরাস্তার কাছে অপেক্ষা করার সমস্ত জায়গাগুলো ভিখারীর দখলে।পেছনে যন্ত্রণার পদছাপ।জ্যোতির্ময় মুকুটে রাতের এ শহর অরোরা বিভায় জ্বলে ওঠে।আমি দুঃস্বপ্নের কালঘোর থেকে জেগে উঠেছি।এ-অন্ধকারে কোথা থেকে আসে এতো অলৌকিক আলো?তুমি তো জলের মেয়ে।নিবিড়ের সজলতা ছুঁয়ে দেখেছ কখনো?একেকটা সুর কিভাবে জড়িয়ে ধরে ঘাস-লতা-পাতা-শেকড়?পাঁজর ফুঁড়ে বের হয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসে শুনেছ উজ্জীবনের কিংবা উচ্ছনের গান?অলস ভাসানে ভেসে চলা বিরহী সময়ে প্রিয় নামের নিঃশ্বাসে বাতিল হয়েছে? মাথার ওপর এক ভাঙা আকাশ।গোলকে পৃথিবীর ছায়া।কেবল শব্দের বোধে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে চোখের সামনে খুলে যায় উৎসারণের রুপান্তরিত মুখ,অপূর্ব সম্ভাবনার শস্যক্ষেত,আলপথ,সেঁতু।আমাদের স্পর্শে বৃষ্টি ঝরেছিল।শ্মশানভূমির নির্জনতা কাম্য ছিল না অথচ অবলীলাক্রমে বিস্তৃত হয়েছে আমাদের ভালোবাসা, সমুদ্র পেরিয়ে গেছে।সৈকতের ভেজা বালিতে মাস্তুল,ভাঙা বৈঠা পড়ে আঁছে আর আমরা পরপরের মগজে খুঁটছি মৃত প্রজাপতিদের ডানা।
৩.
অস্বচ্ছ জানালাজুড়ে আমাদের প্রিয় সম্বোধনগুলো অন্য গ্রহের ধূলোয় ঢেকে আছে।আমার হাহাকারের বুকে গাঢ় গুঞ্জন।কখন বেজে উঠেছিল বিষাদের সুর?সেতারের ছেঁড়া তার বিঁধে আছে পাঁজরে।আমরা বুঝি নি অথচ কথা ছিল বাঁধ হব অন্ধকার প্লাবনের মুখোমুখি কিন্তু বর্ষণের অকাল প্রপাতে ধূয়ে গেলাম বালির মতো।দু'কূল ছাপিয়ে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে পৃথিবীর দেয়াল ও ঢালে।মোহের এ শরীর হয়ত ভেসে যাবে রাত দ্বি-প্রহরের ঘূর্ণির পাঁকে।জলে তাণ,প্রত্যাশার পাথর ভাসছে।তীরে দাঁঁড়িয়ে তোমার অশ্রুপাতহীন চোখে দেখেছি ভিনগ্রহের অন্ধকার,নির্বাসিত মুখের প্রচ্ছদ।একদিন যে বুকের মাঝখানে দিনরাতের রঙিন ফুল ফুটিয়ে ছিলাম---কালো ভোমরার দুষিত দাঁতের দাগে ভরে আছে সেই বুক। এ জ্বালা কখনো নিভে যাবে?আমার বুকের বদ্ধ বাতাসে পাতালগান,চোখে আচ্ছন্ন বিলাপ---অবিশ্রাম অনুরণনের মতো প্রাচীরের নিমগ্নতা ধ্বসে যাবে?মৃত্যুকূপে বেজে উঠেছে ধ্বংসবীজের সুর?আলোর স্ফটিকে মুখ ঢেকে আছ?খুলে দাও।ধারাজলের এ-রাতে পায়রা নদীর ধৈর্য্যশীল বালিয়াড়ি পার হয়ে যাবে?অই পারে নিশ্চিত আশ্রয়!সোনালী-সবুজ শস্যক্ষেতে এগিয়ে যাবার এই দৃশ্য---কার সাধ্য তোমাকে আটকে রাখে?কবিতামূর্খ রমণী,বোঝ নি ঝড়ের পূর্বাভাস,চোরাবালি,সমুদ্র আস্বাদ।সীমান্তের লাল বাতি এখন সবুজ।আড়মোড়া ভাঙে ট্রেন।মনখারাপের বাঁশিতে উদ্বেল সময়ের আপেক্ষিক স্রোত। আমি পৃথিবীর আলোয় অদৃশ্য তট আর শেষ সূর্য্যাস্তের কথা ভাবছিলাম;গোধূলি থেকে ছোট্ট ছোট্ট উৎস্মুখে আদিগন্ত ভালোবাসা পৃথিবীর মোহনায় বিস্তৃত উচ্ছ্বাসে আলোড়ন তুলছে ঢেউয়ে।ভেজা বালির ওপর সূর্যনাম।মধ্যদুপুরের তাত এড়িয়ে সন্তানসন্তুতির মুখে দেখি গভীর প্রশান্তি।এখন কি যন্ত্রণার চাঁচে নিজেকে গালিয়ে নেব?কবিতার অগণ্য পাঠক-পাঠিকার পাশাপাশি আমার স্বজন,অগুনিত শুভাকাঙ্খীদের ছেড়ে যাব?ঘরের চৌকাঠ আর বাগানের সুড়ঙ্গের মধ্যে শিশিরের এতো জল,এতো মমতার ছায়া---অস্বচ্ছ জলের চোরা টান থেকে ফিরে আসব?প্রণত জীবনের জন্যে।
৪.
পরিণতিহীন লক্ষ্যে শিমুল তুলোর মতো উড়ে চলে গেছ।শীতঋতু থেকে দূরে শিকারী ঈগল মাংসখন্ড ভেবে তুলে নিল;এর পর প্রতি রোমকূপ জুড়ে রাতের শিৎকার।এত সন্তর্পণ,চন্দনচর্চিত উষ্ণ নাভী,লোভনীয় উরুতে পরকীয়ার ঝড়।মেঘ ও শস্যের জন্যে প্রার্থনারত যে পুরুষটি শ্বেত ও প্রবাল ঘূর্ণিপাতে দুই হাতে মাটি,লোহার বালতি ভরে জল ঢেলে গেঁথেছিল ভিত,---মাটির দেয়ালে ফুল,লতাপাতা ও পাখির ডানা আঁকা।খড়ের বিছানা ছেড়ে বাঁশের মাচান বেঁধেছিল শেষ সঙ্গমের আগে পুত্র সন্তানের জন্ম দেবে বলে রঙিন পাথর এনেছিল সামনের পাহাড় ও চাঁদ থেকে। আজ তার বুকে অগ্নিভরা জল।ক্রোধ ও বিস্ময়ে ফেটে পড়ে কঠিন পাথর।
মনে পড়ে পৃথিবীর প্রথম প্রণয়,অতিকথা,কবিতা ও কল্পনার নিগূঢ়ে রক্তের ঢল।গৃহঘটে ফুটো,ভেজা লাকড়ীর ধূঁয়া,---জলের শুশ্রূষা নিতে উর্ধ্বশ্বাসে সাজানো সংসার ফেলে সকাল ও সায়াহ্নের নদীতে নেমেছ?আঁজলায় উঠে আসে সামুদ্রিক নুন,মাছেদের দীর্ঘশ্বাস।আমার মুখের মৃত্যুহীন আলোতে অসংখ্য মহাপ্রস্থানের সিঁড়ি।দৃশ্যপটে অগুনিত শবযাত্রা,মৃত মানুষের কোলাহলে কেঁপে ওঠে মনোভূমি আর মানবী আমার ক্ষয়জ্বালার রক্তাক্ত মুখে দুর্বাঘাস নয় বালি চেঁপে ধরেছিলে।
৫.
যথেষ্ট বর্ণনা ছিল না,কঠিন পথ,শীর্ষে বাঁক,---সেইখানে এসে দাঁড়িয়েছ?অদৃশ্য ক্রোধ ও বিবমিষা থেকে কেবল পতিত থেকে যাও।ঔদাসীন্যে মেনে নিয়েছিলাম বিশ্বাসহীন সুন্দরের মুখচ্ছবি---কত অভিমান,অনুরাগ এবং কবিতার আগ্রহাতিশয্যে শীতার্ত রাতের দীর্ঘ প্রহরগুলো সঙ্গমহীনভাবে কেটে গিয়েছিল।নিদ্রাহীন লালচোখে লেখা কবিতাগুলো রোদ্দুর,জল ও মেঘের অনুপম ছায়ায়; যা ছিল শীত-সকালের ধোঁয়াগন্ধ,গাছপালা,নদী এমনকি পূরাণো জুতার সঙ্গে আতংকিত বাঘিনীর ধারালো নখের ছাপাংকিত দাগ বুকে-পিঠে নিয়ে স্তব্ধ জীবনের ফাঁক ও ফোকরে কুঁড়ি মেলেছিল বটগাছ।অশ্বথের ছায়ার রহস্য চিরকাল অজানাই থেকে গিয়েছিল।একাকী মাঠের প্রান্তে স্বরধ্বনি-প্রতিধ্বনিজালে বটের পাতার স্বেদবিন্দু মুছে যায়,মুছে যায় কিশোরীর সারল্য,সমস্ত দুপুরের পথ।প্রতিহত পথ জেগে ওঠে বিকেলের অপরিচ্ছন্ন মুহূর্তে।
গভীর অনন্ত শব্দে অস্থিরতা ছিল।আমি ক্ষমা চেয়েছিলাম।অনুচ্চারিত শব্দ ও বোধের পরিমিত মাত্রায় অনাদিকাল থেকে খসে যাওয়া পাথর,সৌরধূলো,নক্ষত্রের টুকরো,বৃষ্টির ধারাজলে....
আহ!মুক্তির এমন স্বাদ।
৬.
অনেকান্ত জীবনের প্রতি পরিচ্ছেদে,প্রতিটি পাতায় এত প্রতারণা,এত ভুল ও অন্ধকারের পঙতি---দ্রুত বেলা পড়ে যায়।সমসাময়িক জাল রসায়নে স্পষ্ট ফুটে ওঠে লবণ-উত্থাল দোলাচলে গার্হস্থ্য-জীবন।গলিত ললাটরেখা ধরে অতীতের আর্ত কেকারব।নক্ষত্রে সাজানো ডানা নিয়ে উড়ে যেতে চেয়েছিলে।মেঘের সীমান্তে অনেক নৌকার সারি।এতদিনে বুঝে গেছ ক্ষেত্রজ নৌকাও ঠিক সামুদ্রিক স্রোতে খুঁজে নেয় গোত্র পরিচয়।অরোরা বিভায়,গোধূলির অন্তরালে অসাড় অপেক্ষা-শোনা যাবে সমুদ্রের স্বর।সূর্যাস্তের পথে ছিল ঝিনুকের দাগ,শেষ মুহূর্তের কথাগুলো লুফে নিয়ে সিন্ধুশকুনের উল্লাস,উৎসবে ছিঁড়ে নেয় ফুসফুস।প্রতিটি হাড়ের গায়ে ঘূণেপোকাদের বাস তবুও ঠিক পৌঁছে যাও সংকেতের বিকেলবেলায়।দূর অস্তাচল থেকে ভাসে আসে বুনোকুকুরের ডাক আর বুক জুড়ে শুরু হয় শকুনের নখের আঁচড়।
কবরখানার পাশে স্তব্ধ রাত---আবছা পথের পথচারিনী বিন্দুতে বেঁধে ফেলেছ অতীত,বর্তমান আসক্তি ও ক্লেদে শরীরের রেখা ঘিরে অন্ধকার আলো।দিন ও রাতের পায়ে হাঁটে অস্বচ্ছের প্রতিবিম্ব।মাথার ওপর কোজাগরী চাঁদ অথচ সে আলো আলোর আরেক পাশে পড়ে থাকে।ধাতু-সমুজ্জ্বল বেশ্যাদের নগ্ন স্নানের মতোন ছুঁয়ে আছে অন্তহীন বুক কেননা শূন্যতা থেকে ঝরে পড়ে বিষাদপ্রতীক্ষা,নিয়মনিষ্ঠা ও আমাদের দৈনন্দিনতার সমূহ প্রয়োজনের সূত্রাবলী এমন কি জৈবিক ক্ষুধাও।প্রথম সূর্যোদয়ের কালে সূর্যস্তব ও গায়ত্রীমন্ত্রে শুনেছিলাম আশ্বাস কিন্তু কোন প্রত্যাশা ছিল না।সূর্যাস্তের করুণ কান্নায় ভুলে গিয়েছিলাম প্রার্থনামন্ত্র।অস্তিত্বকে ফিরে পেতে পাথরময় পৃথিবী এবং সমুদ্রের বালিয়াড়ি খুঁড়ে যে জল তুলেছি;রাক্ষসরক্তের বুকে স্বতন্ত্র ও অনিশ্চিত অবস্থানে সন্ধ্যা ও নৈমিষারণ্যে সমান্তরালে ছুটছে রক্তস্রোত---ভাটিয়ালী কথায় তা ধূয়ে দেব?
৭.
প্রণত জীবন ছুঁয়েছিল সমস্ত গোধূলিবেলা।স্পষ্ট উচ্চারণে কার্তিক সন্ধ্যার শ্যামাপোকা উড়ে যাবার সৌন্দর্য্যে অদ্ভূত রঙিন ছাপচিত্রে পম্পা-সরোবর তীরে মিশে যায়।অন্ধকারে পাখি কাঁদে আর আঘাটায় এসে লাগে আবর্তিত অভিশাপ।উচ্চকিত তানে বিদায়ের যে সঙ্গীত বেজেছিল তার সুর এখনো প্রান্তর থেকে প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে।প্রেতবনচ্ছায়া ঘিরে চন্দ্রালোকপানরত শকুন-যৌনদ্রাঘিমা ছুঁয়ে অকস্মাৎ উড়ে যায়।উড়ন্ত ঠোঁটের কষ বেয়ে ঝরে পড়ে উচ্ছিষ্ট মাংস,রক্তধারা।
স্বেচ্ছাচারী জীবনের অলিখিত পূরাণে উল্লাসধ্বনি,আর্তনাদ ও হিংসার প্রপাতে অস্থির কালরাত্রি,শাশ্বত উপমা এবং প্রকৃতিপ্রত্যয়বোধে ঘন চুলের ভেতর বর্ষা নেমেছিল---মাত্রাবৃত্ত কদম গাছের সাদা পাপড়ি কী অবিরল ধারায় ঝরেছিল;দ্বিতীয় মানবী,বোঝ নি জলদ মেঘ,বৃষ্টিভেজা দুপুরের পথের অবশ্যম্ভাবী মসৃণতা।নিশিডাকের নাশকতায় ভেসে গেলে পেছনের অববাহিকার কাঁকর,এঁটেল মাটি,বালি ফেলে।
৮.
যা কিছু গ্রহণ করেছিলেঃসামুদ্রিক শঙ্খ,বুনোফুল,নাকছাবিটির হীরা,পুরুষের প্রেমের খেয়ালে রৌদ্র থেকে ছিঁড়ে নেয়া আমার মস্তিষ্ক---একে একে শূন্যে উঠে যায়।তোমার বিনষ্ট মুখে বসন্তের অদ্ভূত স্ফুলিঙ্গ,বিসম্বাদী ডৌল শুষে নেয় আমার অন্তিম প্রপাতের জলধারা।সমূহ সর্বনাশের পূর্বে নিঃশব্দ অগ্নিবলয় ঘিরে আধোশ্বেত ডানার পাখির ব্যাকুলতা,চতুর্দিকে তার ছায়া।এখন বুঝতে পারি কোলাহলরত মৃত্যুর করুণ বাহু কী অবলীলায় গন্ধক মেশানো জলে সাঁতার কাটছে।মালিন্যমুক্তির প্রত্যাশায় পাটিগণিতের পাতার সরল এবং ঐকিকের নিয়মে শ্মশান থেকে শান্ত চোখে ফিরে এসেছ?ধোঁয়ার উৎসারণে নৈশকালীন যাত্রার পথে ঘুমন্ত মানুষ ঠেলে ঠেলে ট্রেন ছুটছে।টেলিগ্রাফ তারের খুঁটিতে কতো টরে-টক্কা---বে-হিসেবী সংকেতে শরীর খুলে বসে আছো?বে-সরকারী আতুরালয় লুকোচুরি খেলে।শরীরের সব দাহ আজও মেটেনি।দ্বিধা-বিভক্তির পাঠ-পাঠান্তরে অধি-দেবতার স্তব,সামমন্ত্রে প্রতারণা।গভীর প্রস্তাবনার এই রাতে খসে পড়ে নক্ষত্র,পৌত্তলিকতা।আমি বুঝি না গ্রহণকিংবা বর্জনের রীতিবদ্ধ অধৈর্য্যতা।ধৈর্য্যচ্যুত শিকারী পাখির রক্তনখে স্বেচ্ছাবন্দী হয়ে জীবন কাটাবে?
সমুদ্রের অনিয়ন্ত্রিত জোয়ারভাটা,স্রোতে পুরুষের রক্তমোচনের তুলা আর সার্বভৌম বেশ্যাবৃত্তির চাতুর্যময় ভঙ্গি---আমি জলের কিনার ঘেঁষে দেখিঃজটিল ও দুর্বিষহ জীবনযাপনের প্রণালী,---ফাঁপা,নিষিক্ত ও কলরোলময় বাঁধ ধরে হেঁটে আসছে নিশীথ প্রণয়িনী।চোখে অবৈধ সমর্পের ছায়া!ব্যথা-বেদনার দূরত্বে আমার চোখ দিয়ে অবিরল বৃষ্টির ধারার মতো লজ্জা ঝরে পড়ছিল আর এই শব্দটির আধিক্যে দু'হাতে মুছে নিয়েছিলাম শ্যাওলা ও চোখের জলদাগ।অথচ রমণী বোঝে নি কংকাল,মদ ও মৃত্যুর শব্দে ঘর ভরে আছে।
৯.
শাল-পিয়ালের তলে অপর্যাপ্ত দিন ও রাতের ভঙ্গুরতার ভেতর অতীতের আসক্তি ভরাট আঙুরের মতো পুঞ্জ হয়ে আছে। প্রতিবিম্বে প্রতিফলিত দুঃখস্নানের পর্যাপ্ত জলে।স্বচ্ছতায় ভবিতব্যরেখাও পেরিয়ে চলে এসেছি।যদিও সব দিন করতলগত মুঠোয় প্রতীক্ষা করে থাকি পাহাড় ধ্বসের অন্তিম গহ্বরে শরীরের সব তাপদহ চেতনাকে স্তব্ধ করে তার রহস্য হারাবে।কল্পণার নিগূঢ়ে সামান্য বুদবুদ---তাও হতে পারি নি।দিগন্তময় স্থির সর্বনাশের সীমায় কৃষ্ণগ্রীব মেঘে নাশকচিহ্ন,লোহার ঠোঁটে রাজ শকুন খুবলে নেয় বুকের নরম মাংস।অন্ধ চোখের পাটল প্রবাহের মধ্যে জলদুঃখ,তোমার সৌন্দর্য্য প্রবলতা---শ্মশানের আঘাটায় বসে নিজেকেও ছুঁতে পারি না এখন।যে ভুলের কাছে ঋণী নই-সুদসমেত ফিরিয়ে ভুলে যেতে মনেও আনি নি।ভাঞা,বিনষ্ট সে মুখে আতুর উৎসব।পথে বা বিপথে কালো পর্দা টানানো।অস্ফুট আলোর খেলার মধ্যে পায়ে পায়ে ভয়,দ্বিধার প্রবল টানে ভেসে যেতে যেতে কতোবার ডুবে গেছ,কতোবার ভেসে উঠেছ পরকীয়ার হলাহল স্রোতে।জলদর্পণের ছায়ায় মুখোশ খুলে গেছে।সত্যিকারের মুখের অবিরল রেখার সৌন্দর্য্যটুকু ছল,---একদিন জানু পেতে ভিক্ষে নিয়েছিলাম,তা ভাসিয়েছি কালো জলে।ক্ষীণ মায়াবশে আজও কখনো কখনো করুণা জাগে।মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি এখন করুণারও যোগ্য নও।
১০.
হারিকেনের আলোয় ঘর ভাসে।তোমার অস্বচ্ছ মুখে থেমে যায় ধর্ম,লৌকিকতা।আমি নিচু ও নিথর হয়ে আমাদের পূরানো দিনের খোলামকুচিগুলূর টুকরো দু’হাতে তুলে নিই।মোহের আকাশ ভরে যায় ভস্মে।যেভাবে নিয়েছিলাম বসন্তের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ,মাটিতে পড়ে থাকা অর্ধেক বিকেল কিংবা নিমপাতা শরীরের গোপন সংকেতে পাঠোদ্ধারহীন শিলালিপি সূর্যরেখায় ছড়িয়ে দেব?পরার্থপর জলের স্রোতে ভেসে যেতে দেব? কবোষ্ণ দু’হাতে এখনও মেহেদীর দাগ,আদূল নখের কোণে রঙের প্রলেপে বিভা---এইভাবে মুছে ফেলে নদীর ওপারে চলে যাবে ভাবি নি কখনো।শালকীর চকচকে বালিয়াড়িতে রোদের তীব্র প্রফলনের বিম্বে পুড়ে যায় চোখ।পায়ে ফোস্কা পড়ে গেছে।ফেরার বিরাম নেই।যে ঘরে পূর্ণতা ছিল কাল,---শূন্য সে ঘরে ইঁদুর,তেলাপোকা....
অনন্ত বৃষ্টির শব্দে শুধুই পথের কথা ভেবে ভেবে নির্ঘুম শরীর নিয়ে পড়ে আছি।কৈবল্য মানি নি।মন ও চৈতন্যে জ্বর। অধিকারহীন ভাষায় অগ্রাহ্য ছিল শাশ্বত উপমা,চিরন্তনী প্রেম।গ্রীষ্মাবকাশের সেই সমস্ত দিনের আশা ছিল।সফলতা ও কর্তব্যহীনতার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিগুলো স্বস্তিকা চিহ্নের মতো আমাদের মাঝখানে শুয়ে ছিল।জল এবং কৃপাকণাবাহী বর্ষার জমজ মেঘ চোখে মেখে আবার বৃষ্টির মধ্যে স্বস্তি পেয়েছিলে সুখ যদিও ছিল না।
সৌরধূলোয় আচ্ছন্ন পথ,চোখের কোটরে খড়কুঁটো,জল নেই।নিষ্কৃতির চেয়ে বড়ো দুর্দুমনীয় উৎসবে কোনো অপরাধের,ক্ষতির কথা মনে পড়ে নি অথচ আমাদের পারস্পরিক সমঝোতার মাঝখানে সেই পর্দা এখনও স্থির,ভিনগ্রহের বাতাসে একটু একটু কেঁপে যাচ্ছে।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন