শুক্রবার, ৩০ মে, ২০১৪
ধূপের মতোন উড়ে গেছে প্রতিশ্রুত প্রেম-২
১১.
তোমার মুখের চিত্র ও রেখায় দিশেহারা ভাব,মাটির বিচ্ছেদ থেকে রক্তের বিষাদে শত শরতের বীর্য।কৃষ্ণ রেশমের মতোন ঝলসে ওঠা আনত দু'চোখে সামান্যই ছায়া।ভরা রৌদ্র ছুঁয়ে দিলে বাষ্পে বাষ্পে শরীর শীতল হয়ে যাবে।আমার ঔরসগন্ধ মুছে ফেলে তোমার শরীরজলে কার ছায়া পড়েছে?জঙ্ঘায় কোন পুরুষের সুখস্পর্শে বিভোর এখম?বরফ গলার মতো গলে গেছ,নদী হয়ে গেছ?তোমার সহজ জলে নৌকা ভাসায় নগ্নপুরুষ।উরুর সীমানা পার হয়ে যে পেয়েছে সবুজ ঘাসের স্পর্শ---কাকে তুমি প্রতারণা করেছ,রমণী?স্বামী,প্রেমিক,নিজেকে?ইন্দ্রগোপ কীটের দংশনে ফুলে ওঠা ঠোঁটে লোম গজিয়েছে। তা-কি দর্শনীয়?তা-কি গ্রহণীয়?দু'হাতে জ্বলন্ত ভস্ম মেখে জ্বালিয়ে দিয়েছ সাজানো সংসার,ঘর।নিয়মের রীতি পার হয়ে কতদূর যাবে?
নান্দীমুখর পানশালায় পানপাত্র,বোতল উড়ছে শূন্যে।অন্ধকারে পালটে যাচ্ছে রতিসঙ্গী।মিলনের কালে মনে পড়ে প্রথম শিহরণের অনুভূতি,রকনিষ্ট প্রেম?সূর্যোদয় থেকে সায়াহ্ন অবধি পৃথিবীর একাগ্র আলোয় পথ খুঁজে ফিরে এসেছিল যে সুন্দর হাঁস---তার জঙয়ে দৃশ্যদ্বতী নদী এখনো প্রস্তুত।
শীত ও গ্রীষ্মের মাঝখানে খাঁড়ি মোহনার উৎসে যে রক্তবিন্দুর মতোন পোকা নিষ্পাপ ভ্রমরনীল চোখে সাজিয়েছিল স্বয়ংবর সভা---অভিশাপগ্রস্ত আরুঢ় বাতাসে মৃত্যু ঘটেছিল প্রথম শ্যামাপোকার।এখন সমস্ত সানুদেশ জুড়ে অধঃপাতের কুয়াশা,আধোশ্বেত দৃষ্টিতে নির্লজ্জ হাসি,ঐশীবাণীর মতোন অন্য পুরুষের স্তবে সাজিয়েছ অবমাননার ধর্মগ্রন্থ।
১২.
নূতন ভাষা ও স্বর শিখে নিয়েছো?অভিযোজন,অভিগমণের পথে এতো আগ্রহ?তোমার করপুট থেকে ঝরে পড়ে প্রেম,ধর্ম,সঙ্গীত,বিকেল?অপর্যাপ্ত সাংসারিক জলে এতো বিভাজন?সহজ রান্নার গন্ধ ভাসছে।শীত ও স্মৃতি এমন ঘুমকাতর?জেগে ওঠার সময়ে আমাদের ছেঁড়াখোঁড়া পালে লজ্জারুপ আলো এসে পড়ে---ঐ আলোর শেষে রক্তমাখা নখে উঁচু শিমুলের ডালে বসে আছে শকুন।অশ্রুত স্বরে মৃত নাবিক ও প্রেত,স্বপ্ন বিসর্জন এবং ভাসানের গানে ভরে ওঠে নদীর দু'পার।একদিন নগ্নতার সুর বেজে উঠেছিল বুকে,আদি প্রাণ জল থেকে,---সেই সুর স্রোতের সাথেই ভেসে গেছে।এখনও বুকে উঠে আসে বাষ্পভার।
ক্ষরণের দিনে এই যে উত্থান,পতনের ধারা....শুক্ল মহিমার রাতে মনে পড়ে অন্ধকার,পাথর যুগের ব্রুণচিহ্নে সারাৎসার উড়ে যায় ধর্মজিজ্ঞাসা,গরীবজন্ম,সাহিত্য সাময়িকীর পাতা।গোচরীভূত শব্দ ও বোধে চোখ ঢেকে রেখেছো?অক্ষরগুলো তার দীর্ঘ নখে সম্পন্ন শব্দের ছাপ ফেলে যায়।সেই সুমন্ত পথের প্রান্ত তোমার অজানা ছিল?অতিকায় ঘোর ভেঙে নিঃশ্বাস ফেরাবে পৃথিবীর দিকে?আজ পথে যত সীসা ও গন্ধক, মেদমজ্জাহাড়, হৃদয়ের অন্তঃক্ষরণ,মরঙহাতী নেশা,---চরাচর ডুবে আছে বিশালাক্ষী অন্ধকারে।জলমন্ডলের ছায়ায় বিষাদ।বৃষ্টিহীন সমস্ত প্রান্তর ঢেকে আছে চাপ চাপ রক্তে,ভেদবমন,রজঃশলার।স্মৃত ও অস্মৃতে এই বুক ভরে আছে মেঘে,পাথর ভেঙেছি শুধুই তোমার কথা ভেবে ভেবে।তোমার ঠোঁটের কোণ থেকে অধিদেবতার যে স্তব বেরিয়ে আসে-অধর্ম ও শঙ্খের ফুৎকারমতো তার ধ্বনি অন্ধকার থেকে অন্ধকারে গড়িয়ে পড়ছে অই বর্তুল গহবরে।চিরজাগরুক চেতনায় বিষণ্ণ প্রতিভাকণা ছিঁড়ে ফেলে ক্রমাগত বাঁশের বাঁশির সুর,কবিতার আহ্লাদ ও আতিশয্যে,অশ্রু ও অক্ষরে ঢেকে আছে আমার শরীর।কবিতার শ্রম-বিনোদনে যে মগ্ন প্রাচীর আজ বাঁধা-সমূহ সর্বনাশের আগে ভেঙে পড়ে অশ্রুজলের আঘাতে।
স্রোতঃপ্লাবী রমণী,শেফালীগুচ্ছে গন্ধ শুঁকে দেখঃনিরাকার প্রেমে বেদনার রাত মোহ নিয়ে আসে প্রেতসন্ধ্যার উচ্ছ্বাসে।
১৩.
এ-শরীর জলপোড়া
এই করোটি অনুশোচক
জলপোড়া প্রকৃত শরীর প্রকৃতিবিহীন।অনুশোচক করোটি ভরে আছে অতীত,আসক্তি ও কীর্তিগাঁথায়।আলোছায়াময় টানারাত ও দিনের বিভাজনে,বনগত বনানী বিভায়,নির্জন খাঁড়ির মুখে অপব্যয়ী জীবন বিহ্বলভাবে জেগে উঠছে।সমাধি মন্দিরের প্রশস্ত চত্বরেম শতাব্দীর মৃত শোভাযাত্রা,যুগ্ম পাথর ও শ্যাওলার আস্তরণ পার হয়ে প্রেতিনীর দাঁতে কামড়ে ধরেছ এ মরজগৎ।দ্রব,--লবণ ও হলুদের মিশ্রণে ফুটছে জল।হরিণমাংস ঝুলছে,ডালে।ধোয়ঁআর নিভৃত রেখা ও আশ্লেষে তীর্থ ও বাগানে পোড়ামুখ দানবের চক্ষুষ্মান বাচালতায় সাজিয়ে নাও নিজেকে।উৎসবে,ঝাড়লন্ঠনের নাচে তোমার শরীর ঘিরে অন্ধকার শুধু জ্বলজ্বল করছে তোমার আঙুলের আঙটিগুলোর পাথর।
পায়ের পাতায় অসুখ।কোথায় নাচ?উৎসবের পানীয়?সমস্ত রাত জেগে আছি।জানি,পূর্ব নির্ধারীত নিয়তি তোমাকে ভাসিয়েছে আবর্তিত ক্রোধ এবং শোণিত প্লাবনে।অস্বচ্ছ বিম্বের এই পরাভব বুকে তুমি ছুঁয়ে গেছ আতপ্ত হৃদয় ও নিবিড় ধ্যানে মাঝরাতের মানুষহীন পথে।শষ্পমুলের অবৈধ আদরের মর্মর তোমাকে ঘিরে রেখেছে।জীবনটাকে বোঝো;আজ যা জীবিত তাকে স্পর্শ করি না কারণ জীবিতেরা স্পর্শ বোঝে।পৃথিবীর প্রতিচ্ছায়া থেকে বৈধাবৈধ্যের অজস্র শরীরের প্রেমে দ্বিধা এসেছে কখনো।ভিনদেশী পথিক শরীর থেকে খুলে নেয় শেষ আচ্ছাদন আর দুই পায়ে দুঃখের ধারালো কাটা বিঁধে থাকে।
পথে পতিত যে ফল হাতে নিয়েছ;উপচেপড়া পূর্ণটান জলস্রোতে ধারাময় যা-কিছু কলংক---শ্বাসকষ্টময় ফুসফুসে ভরে নেবে?প্রেত পায়ে বেড়ে ওঠে পৃথিবী তোমার।ঘুমের ভেতর জেগে ওঠে ঘরের বিষাদ ভুলে গেছ,ভুলে গেছ প্রিয় নাম?আমার বুকের মধ্যে দেখেছ অপর পুরুষের ছায়া?ভুল পায়ে উঠে এসে জলজ ভাষায় মাথা নিচু করে বলঃপাখিওড়া ছায়াতেই সমূহ স্বপ্নগুলোর শেষ পরিণতি।ছন্দপতনের বৃষ্টিহীন দিনগুলো একা পড়ে ছিল আর শীতার্ত প্রহর থেকে আমার মেরুদন্ডের শাঁস তুলে পৃথিবীময় ছড়িয়ে দিয়ে কি করে ভুলেছঃআষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টির বিন্দু কপালে মাখিয়ে নীল শাড়ীর আঁঅচল ভরেছিলে প্রফুল্ল কদমফুলে।
আমাদের নৈঃশব্দের নিঃসীমতায় ঝাঁকড়াগাছ,পাথরকুঁচি সময়ে বিচ্ছেদের অপার বিস্তার।কামরাঙা বনের সবু জালে লক্ষ কীটপতঙ্গ পড়েছে।হাহাকার,শূন্যে ও বীভৎসতায় সেগুলোর রক্ত ঝরে পড়ে।নাও,গ্লাস ভরে পান করো রক্ত,মদ,বুকের আগুন।বীজ ও পোকায় ঢাকা আমার অনন্ত করোটিতে খর শীত,সব ঝর্ণা জমে আছে।স্থিরতর জলে ইতঃস্তত কিছু স্মৃতি ডানাভাঙা হাঁসের মতোন পড়ে থাকে শুধু।
১৪.
অসাড় দিনেরা ঘিরে আছে মুহূর্তের সব ভুল।চমৎকার সব ছবি ছিল চোখের পাতায়।পূর্ণটান জোয়ারে বসন্ত,উড়োচুল,---বাতাসবিহীন অন্ধ ঘরে অবশ শরীর ছুঁয়ে আছে এক জীবনের পরাভব।বাতিল খোলস ফেলে ক্ষতহীন মুখে শীত সকালের সজীবতায় উপচে ওঠা ঘনায়মান নিঃশ্বাসে পুড়ে যায় আতপ্ত হৃদয়।অসামঞ্জস্য পরিণতির মণিকর্ণিকার আভা ও চতুর্দশীর অন্ধকারে বিচূর্ণিত পাঁজরের ভেতর শুশুক সাঁতরায় আর কপালে ছিটকে এসে লাগে জলের তিলক।এপিটাফহীন জীবনের প্রার্থনাও ছিল অপরাধময় ইউক্যালিপটাসের বনের গন্ধের দিকে।বুকের ভেতর দাহ,অগ্নি ও জলের সে-দাহনে জেগে ওঠে পশুআত্মা,আদিপ্রাণ,---মৃতের স্ফটিকমাংস মুখে উৎপ্রেক্ষা ও উপমায় মাতামুহুরির চর ও সিংড়ার বনে পাখিওড়া ছায়ায় নিজেকে দেখিঃপৌনঃপুনিক বিচ্ছেদে শতচ্ছিন্ন শরীরের ধড়ে শ্যাওলা,ছত্রাক,বীজানুর অধিকৃত কলোনী,ঝিঁঝির ডাক....
শুকনো চরায় যুক্ত ডানার পাখিরা ওড়ে।ভাগচাষী,চর-দখলকারী নায়েব-গোমস্তার মাথার ওপর নিরামিষাশী পূর্ণিমাচাঁদ জ্বলে।অনুপম রুপক ও চিত্রকল্পে ভরে ওঠে আমার মস্তিষ্ক।অভিজ্ঞানলব্ধ,মুক্তকছন্দে লিখিত কবিতারা অক্ষরের ক্রম ও সম্পন্ন শব্দে চরাচরে জন্ম দেয় এক নূতন বোধের।আমি পায়ে পায়ে ঘরে ফিরি অসময়ের বৃষ্টির ছাঁট গায়ে মেখে।চোখে ব্যথা নেই,কোটরে খড়ের স্তুপ।ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মুখে ত্রেতা যুগের ভাবানুষঙ্গে এবং তৈরী হতে থাকি আগামীর অর্ধেক জীবনে;যা কাঁটায় ক্ষত-বিক্ষ,অঝোর রক্তপাতে মতিচ্ছন্ন ফুটে আছে।শ্বাসনালী ছিঁড়ে উঠে আসা শ্বাপদসুন্দর শ্যামলতা ও স্মৃতির মৃত ডানাগুলো রক্তিম মুহূর্তে আলো জ্বালে।শরীরের প্রতিকোষে বোধবুদ্ধিহীন জেগে থাকা জলটুকুছাড়া আর কি-ই বা পাথেয় আছে?শান্ত প্রবাহদুয়ারে সিংহরাশির প্রচ্ছায়া,জ্যোতিষির সম্ভাবনাময় মুখের আশ্বাসবাণী এবং আকাশের মুখোমুখি নির্মিত বিশাল চন্দ্রাতপে সূর্য ডুবে গেছে।একে একে নক্ষত্র ফুটছে--তার ছায়ায় উঠোন ভরে আছে আর একে একে জেগে উঠছে ্নামফলকহীন পিতৃ-পুরুষের কবর---তাদের ক্ষতে,ভস্মের ভেতরে জমে আছে অনিশ্চিত সময়ের ধারা,তাম্রলিপি,গুহাবাসের বিস্মৃতি।
দ্বি-চারিণী নারী দ্বি-প্রহর মুখে সমকালীন বটের ঝুরি কিংবা বস্তু-ব্যাপক মাটিতে স্বচ্ছতাবিহীন পদচ্ছাপে এগিয়ে চলেছে নষ্টনিধি আবাসিকে,নৈশভোজের উৎসবে।তুমি তো আমিষভোজী।রাত দুপুরের উপুড়করা প্রদীপে সভ্যতার মাংসখন্ড মুখে শরীর চাটছে উপজাতীয় যুবক।প্রতিপদী চাঁদ ঝরছে আকাশ থেকে।
১৫.
ধ্বনিবহুল জীবন আর সঙ্গীতময় শোবার ঘরে সরীসৃপ---স্বতই যা উঠে আসে প্রেম,বিরহ ও লজ্জাহীন শোকতাপ অথচ আমার রক্তলেপা হাড়,হাড়ের ভেতর ভাঙা সেতু,---তাকে পারাপার করে অবিশ্বাস,জ্ঞাত জগতের ব্যতিক্রম।পূবের সমুদ্রপথে অন্ধ কুয়াশা প্রদেশ।ফিরে আসার সময়ে ধীবরের জালে ধৃত নীলশরীরে যৌনের দাগ।ধীবর হাসছে---সুষম ও পরীক্ষামূলকভাবে প্রাকৃত ভাষার ছবি শানানো।মশল্লা প্রস্তুত।প্রশ্নোত্তরের পর্বে ঝগড়াটে কাদাখোঁচা পাখিগুলো পাতার আড়ালে জৈবফুলে নিঃশ্বাস ছাড়ছে।এই ফুল যৌগিক অথচ এর ফলগুলো সরলীকৃত বিন্যাসে ভারানত।মেরুদন্ড ঘিরে ভ্রষ্ট উপদ্রবে একাকী সমুদ্র পাড়ে হাঁটি।পূবে বা পশ্চিমে নয় দক্ষিণের জগতে তৃতীয় এক অসম্ভব পৃথিবী জ্বলছে।দুই হাতে কলংকরেখার উচ্ছলতা নিয়ে অজ্ঞানতাকেই ধর্ম বলে মনে মেনেছ,মহান সত্যে রাবার ঘষেছ যদি পাল্টে যায় প্রিয় নাম,প্রিয় মুখের প্রচ্ছদ?সকালের পরিশ্রুত রোদ গায়ে মেখে অগম্যগমণে নদীপথ পার হয়ে এই বালিয়াড়িতে নেমেছ?এইমাত্র সূর্য ঢেকে গেল।পটভূমিকায় কালো ডানার মেঘের ওড়াউড়ি।আমার চোখের জলে নীল হয়ে যায় অফলা পৃথিবী আর শরীরের কানায় কানায় জেগে ওঠে পানাবৃত্ত,মৃত্যুর ঝলক।দুইহাতে কলঙ্করেখা অথচ পাথরে পাথর ঘষে জ্বেলে নাও প্রতিদিনের পূনর্বাসন।চারপাশে মৃত্যুর স্তব্ধতা এবং কোলাহলে বিশীর্ণ আঙুল শূন্যে উঠে যায় প্রার্থনার প্রার্থিত প্রহরে আর সন দান,ধ্যান,তপস্যা ও সিদ্ধি নষ্ট হয়ে যায়।তোমার পায়ের তলে গুড়ো হয়ে ঝরে পড়ে বরফ কুচির মতো।পাপ থেকে পাপের স্খলনে সমস্ত শরীর জ্বলে ওঠে।পরাহত জীবনের পাঠ,অসম্পূর্ণতা ও পাপ- থেকে যে গোপন রক্ত শরীরে বইছে---তার সবটুকুই নিষ্ফলা,বীজিহীন।লজ্জা লুকোতে যে কবর খুঁড়েছিলাম তুমি সোৎসাহে সেখানে জল ঢেলেছিলে অন্যপথে,নিভৃত রেখায়।ভয়াবহ প্রশ্ন ও বিচারে রক্তাপ্লতা নিয়ে আসে প্রসূতির রক্তমাখা রাত এবং নবজন্মের মতোন পাপজলে ভরা পৃথিবীকে মুক্ত করে নাও তোমার আশ্লেষ থেকে।
১৬.
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার বইয়ের পাতা উলটে বন বিভাগের নির্জন বাঙলোয় জামাখোলা,কাঁচুলিবিমুক্ত স্তনে মুখ রাখে কামোন্মত পুরুষ;শরীর সর্বস্বের এই খেলায় রমণী তোমার জারিত যৌনরস ঘামের ফোটার মতো উরুসন্ধি,জঙ্ঘা বেয়ে পায়ের পাতায় এসে থেমে থাকে।থেমে থাকে সভ্যতা,দ্বিধার টান এবং বিসর্জনের বাজনা।বাজনাদারেরা একে একে অন্ধকারে ডুবে যায়।জৈবজটিলতাহীন দুইচোখে অসুন্দরের বর্ণমালায় উড়াল পথের ছবি এঁকে দেয় প্রতিশিল্পী।একেকটা দিন এভাবে হারিয়ে যায় অন্ধকারের গহবরে আর আমার নিঃশব্দ মুখের প্রচ্ছদে জমে ওঠে তিনপুরু ধূলোস্তর।অইদিকে বাঙলোর পেছনে উপাসনাভেঙে ডেকে ওঠে প্রিয় কাক।স্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনিতে বনের নির্জনতা খান খান হয়ে ফেটে পড়ে।
আমি কতোবার করজোড়ে বলেছিঃতোমার কলঙ্কের কিছু ভাগ দাও।শোন নি প্রার্থনা।শুধু চাঁপাকলির আঙুলে বেড়ে গেছে আঙটির অজন এবং সংখ্যা।আড়ালে আগুন,করতলে ছাই মেখে ঘরে যেতে ইচ্ছে নেই।গলিত শরীর নীরবতা মেনে জেনে গেছে তার শেষ পরিণতি।দ্রবীভূত সময়ের আলো এসে পড়ে প্রকট চোয়ালে।ক্লান্তিহীন অনন্ত অভ্যাসে বুকের পাপড়ি মেলে অবৈধ সমর্পণের মত্ত রাতে যা কিছু পার্থিব,নৈসর্গিক এবং দুঃস্বপ্নতাড়িত---এতোগুলো ক্লান্ত ভোর মুছে ফেলে আদরের কলঙ্কিনী রেখা।
কুয়াশায়,সূর্যের বেলায়,অপরিমিতের ঋণে আমি কেঁপে উঠি জলের কাঁপন ও অস্থিরতায়।কুর্চিফুলে ঘেরা বাঙলো।এবারই প্রথম ফুটেছে কিন্তু অকল্পিত মুক্তিতে অগণ্য কীটপতঙ্গের দৃষ্টিপোড়া;গুঞ্জরণে যারা উড়িয়েছে স্বপ্নের উদ্ধত পাল।জল ও স্রোতের মাঝামাঝি ক্ষেত্রজ নৌকার সারি।গন্তব্যে স্থির ও সাবলীল যাত্রা।অনিশ্চিতের গন্তব্যে রুমি কোথায় চলেছ?অসম দাহের বুকে কোন কিস্মৃতি ও সহসা লুপ্তির ঘাটে অনন্ত যাত্রার শেষে?প্রতিটি তন্দ্রার ঘোর থেকে উঠে আসে শ্বেত-সূর্যরাত্রি।তারপর অপেক্ষার পর অপেক্ষার প্রহরে দু'হাতে পুঁথি ও রান্নার জলে পূরোনো সে ঘ্রাণ।মাথার ওপর সূর্য জ্বলছে।সূর্যের ভস্ম,ছাই এসে চোখে লাগে।
১৭.
রক্তের ভেতর বান---নৈতিকতাবর্জিত ও স্খলনের।পাপ ও দুঃখনদীর ঘাটে এসে লাগে চির হরিৎ ক্ষিধের নৌকা।পরমান্ন কই।ষষ্ঠীতলা,ভাঙা দেয়ালের পাশে সাপের খোলস পাল্টানোর গান।এই গানে ঘর ছাড়ে মেঠো ইঁদুর,ব্যাঙ।আমার বিশীর্ণ শরীরের চামড়া ছেঁড়ার শব্দে ভুলভাবে ফুটে ওঠে ফুল আর ক্ষুব্ধ জল ঠেলে নির্বিকার হাতে তুলে নাও কর্কট মাংসের খন্ড।বিভ্রান্তি ও ভুল থেকে যে সৌন্দর্য্য---সানুদেশ পার হয়ে যাদুঘর,নিলামবাজারে সংগৃহীত স্তুপের মতোন পড়ে থাকে।উচ্ছিষ্টের ভাগ চাই নি কখনো উৎসব-বাড়ির কুকুরের মতো।কাশের জঙ্গলে,প্রতিমা,তক্ষণশিল্পে এবং উৎকেন্দ্রিক কবিতায় একদিন নিরুপায় ডেকে গেছি অতৃপ্ত প্রেমিক।পাহাড়,নীলগিরির অল্প গন্ধের ম্যাগনোলিয়া;সহজতা যার প্রশ্নাতীত--টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়ে বিদায়বেলার গানে।মায়ান ও পিরামিড সভ্যতারও পূর্বকাল থেকে ঠিক এইভাবে হাহাকারের দারুণ চিতা অনিমেষ জ্বলে জ্বলে উন্মীলিতা রাতগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে আর প্রিয় রমণীরা অন্ধকারের ওপারে চলে যাচ্ছে।অধিদেবতার জলভারে ছিন্ন,প্রবল ও নত হয়ে।জলের ওপরকার স্তর ভেঙে তার প্রতিটী রহস্য এই গ্রীষ্মাবকাশে অবচেতন মন ও মননে গেঁথে যা যা চেয়েছিল,---রক্ত,মদ,নগ্ন যৌনতা,অগ্নির সর্বস্বতা নিমেষের লবণজলের স্রোতে ভেসে যায়।অস্বচ্ছ বিম্বের মুখ ফসিলের ফুল হয়ে ফুটে থাকে পান্ডুরেখাজলে।মাটিছোঁয়া দিগন্তের প্রতিমুহূর্তেই মৃতসহযাত্রীদের অনুগমনের পথ বন্ধ করে স্ব-প্রণোদিত বর্ষাফলক হানে জর্জর বুকের পাঁজরের হাড়ে।সাজানো অক্ষরগুলো হাতে নিয়ে বুকে শ্মশানের পোড়া ছাই,ভস্মকণা মেখে শ্মশানতলায় জীবনের পাঠ নিতে নিতে দেখিঃপ্রেতিনির যোনী ঢেকে আছে সমস্ত প্রান্তর,পিণ্ড ও তর্পণে মেতে আছে প্রেতদল।সমবেত পাঠ ও প্রতিপাঠের কালে রমণীর চোখের স্মৃতিতে জমে ওঠে অন্য ব্যভিচার,অন্যরকম প্রেমের চোরাস্রোত।মুখগুলো দেখা যায় না-প্রতিবিন্দুর মর্মজল ঘিরে নাশকতার রক্তিম আভা।কতগুলো,দিন,কতগুলো ক্লান্তিহীন রাত লোভীর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।এ-কি আত্মঘাত নয়?এ-কি ধ্বনহসের দেয়াল গাঁথা জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়?
ভীড় করে আসে অমূলক প্রশ্নদল।
গুহাচিত্র,ভাস্কর্য ও জল ধরে আছে গতিমালা অথচ নিঃশব্দ জীবনেরে খরতার স্বাদে তেতো হয়ে ওঠে অন্তরাত্মা।কাকদুপুরের প্রহরে আকাশ ভরে যায় এমন অন্তঃক্ষরণ---বিপরীত জলে জেগে ওঠে সাজানো সংসার,ঐকান্তিক প্রেম।ডুবে যায় বাড়িঘেরা প্রসন্ন উঠোন,সুখময় সুখের ধমনী।ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল দামভর্তি ব্যবহৃত পুকুরের জটিল শিয়রে?হেলেপড়া তালগাছের ছায়ায় সূর্যাস্তের গোধূলি দেখার?অবশিষ্টে পড়ে থাক উপক্রমনিকা।বৃষতিমুখর দিনের চলচ্ছবি ভেঙে যে ক্ষেত্রজ নৌকা এগিয়ে চলছে অল্প কিছু সময়ের ব্যবধানে সেটা ইতিহাস হয়ে যাবে।তারপর ঢেউ।শুধু ঢেউ।
আজ আমার বুকের মধ্যে না ঘৃণা,না ভালোবাসা!
১৮.
একেকটা স্তব্ধ মুহূর্তে মুখ ও মুখোশের শ্বাসে আমাদের মুখোমুখি ব্যঞ্জম ও স্বরধ্বনিগুলো ভূতগ্রস্ত ভেবে দূরে সরে যায়-জৈবজটিল তোমার দুই চোখে জেগে উঠুক বুকের খুবলেনেয়া আলো।সে আলোরধারা শব্দ নির্মাণ ও বিনির্মাণে রক্তঘটে এঁকে দেয় সিঁদুরে আল্পনা।নতমুখ বিকেলের এই আধা-প্রেম,আধা-ভালোবাসা পড়ন্ত গোধূলি বেলায় ঢেকে যায়,ঢেকে যায় তুলসীমঞ্চ,মন্দির,বটগাছ।
বুকজুড়ে ছিল পারিজাত প্রেম,শুদ্ধতর ভালোবাসা কিন্তু অপ্রেম ও কালিমায় ঢাকা তোমার চোখের মণিকর্ণিকায় ঘোর সূর্যাস্ত কেবল কৃষ্ণাদ্বাদশীর চাঁদ জ্বলে।
সমুদ্র তীরের ঝাউবনে সশস্ত্র সন্তাস,মাছেদের শব দূরে রেখে আমরা নেমেছিলাম সমুদ্রের জলে।অন্ধকারের জ্যোৎস্নায় নতজানু সৈকতে প্রেতের নৃত্য,ভূত-উৎসবে চুবড়ি গন্ধ।
১৯.
একাকীত্ব কিংবা ধ্রুপদী গানে মৌনমুখ বিকেলের নদীর কিনার আর শ্মশানভূমির পাশের ঔষধি ক্ষেত ভরে ওঠে।আমি ভূগোলের জরাজটিল প্রান্তর থেকে মূঢ় মানবজন্মের স্মরণাতীত উজানসিন্ধু পার হয়ে বধির ও অন্ধদের পেছনে পেছনে হেঁটে গেছি গঙ্গা অববাহিকায়,নীল নদের উৎসের জলে।শালপ্রাংশু মাঝরাতে কুয়াশায় ঢাকা যক্ষধন হাতে চুপি চুপি ফিরে এসেছিলে অনায়াস,অন্যমনে?তোমার সে বিকৃত মুখের ফুলে এক মৃত্যু থেকে আরেক মৃত্যুর পথে দলবৃত্তে অন্ধ ছিল।
সমুদ্রের তলদেশ খুঁড়ে কোনো শঙ্খ আমরা পাই নি।
২০.
দৃশ্যমান বাস্তবতার নিরিখে বহুরাত্রি পূর্বের উৎসবে আরো অন্যসব পুরুষেরা এইসব ঐশ্বর্য,সংসারসমুদ্রের কূটজ্ঞান এবং ক্ষুধার সমূহরুপে তোমার সুডৌল স্তনে সেঁটে দিয়েছিল যৌনতার ইস্তাহার।দ্রুতলিখন অক্ষরে উড়ে আসা শীতের প্রথম হাঁস;যার ডানায় রক্তের ছোপ,দূরাগত দুপুরের প্রান্তদেশ এবং বুকজুড়ে অনেক নখরাঘাত যেন আদ্যিকালের মেঘের ভার।সেই থেকে আমি আর ছুঁয়েও দেখিনি শীত সকালের সাদা হাঁস।বনের অর্ধেক কাটা গাছে প্রতিহত রক্তছাপ মেখে আমিও কাঠুরেদের মতো প্রতিশ্রুতিবদ্ধঃবন্য ও আরণ্যসম্পদের প্রতি চিরদিন উদাসীন।
অনুশাসিত অতীতে আশা-আকাঙ্খার বিমূর্ত প্রতিকৃতিতে দেখেছি তোমার অধৈর্য্যের উরু আর স্বপ্নাহত কৃশপায়ে চঞ্চল হরিণ গতি;ঘোর কুয়াশায় ছুঁতে গিয়ে দুই হাতে আগুন ছুঁয়েছি;যে ঘাটশীলায় বসে ছবি এঁকেছিলে---তার কিছু চিহ্ন,দুই এক বিন্দু অস্বচ্ছ রঙ পড়ে আছে শুধু।
উত্তরদক্ষিণে বিস্তৃত পৃথিবী এবং এর মহাজাগতিক ত্বকে,বাঁধ ভাঙা জলে যে ঘরহারা মানুষেরা আতশবাজির শোভাযাত্রায় মেতেছ আর হতভাগ্য রমণীরা তাদের আঁচলে স্নেহরব বুলিয়ে দিয়েছে।ঘামে জর্জর মুখগুলোতে শুধু তোমার ত্র্যহস্পর্শের জলে ভাসে মসলিন স্বপ্নের ভাষা ও শেষ রাতের প্রহরে বলা স্রব্ধ কথামালা।
আমার বুকের স্ট্রেচারবাহিত রক্তস্রোতে সেই একই নক্ষত্র,দূর আকাশের কিছুদূরে ভেসে আছে চাঁদ।শোনা যায় অপঘাতের কল্লোল,ব্যাথাতুর আত্মার ভেতর লক্ষ হীরামুখী সুঁইয়ের আর্তনাদ--তার ভেতর নিমগ্ন স্বপ্ন,স্বপ্নের ভেতরে প্রতিপদী স্বপ্নে পদ্মপাতায় টপকে যায়।
সশব্দ ও আশংকায় ভাসমান কচুরিপানায় উদয়াস্ত পোকামাকড়ের বসতি অথচ লাফের আহ্লাদ আর চোরা ঘূর্ণিটানে পর্যুদস্ত অন্ধকারের ভেতর ডেকে বলছঃএ পথে নয়,অই পথে....।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন